রাহুল দেব বর্মণ: বাংলা গানে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদান এবং শেষ কাজ
Saptarshi, a finance professional, has a camaraderie with his camera…
রাহুল দেব বর্মণ শুধু হিন্দিতে নন, বাংলা আধুনিক গানের জগতেও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৭০ সালে তাঁর প্রথম বাংলা ছবিতে সুরারোপের পর কিশোরকুমার ও আশা ভোঁসলের কণ্ঠে তাঁর অসংখ্য গান বাঙালির হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। প্রয়ানের আগে কলকাতায় তাঁর শেষ বাংলা অ্যালবাম “সুরে সুরে জাল বোনা” রেকর্ড হয় ইন্দ্রানী সেনের কণ্ঠে।
রাহুল দেব বর্মণ বত্রিশটির কাছাকাছি প্রকাশিত বাঙলা ছায়াছবিতে সুরারোপ করেছিলেন । কিন্তু বাঙলা আধুনিক গানের ক্ষেত্রটি ছিল তাঁর অনেক বড় । ১৯৭০ সালে “রাজকুমারী” ছবিতে প্রথম সুর দেওয়ার আরও তিন বছর আগেই তাঁর সুরে বাঙলা আধুনিক গান রেকর্ড করেছেন কিশোরকুমার -“একদিন পাখি উড়ে যাবে যে আকাশে” । ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সুরে আশা ভোঁসলের দুটি গান । “যাব কি যাব না” এবং “ এই এদিকে এস , কথাটি শোনো“ – প্রকাশিত হয়েছিল পুজোর গানের ডালিতে । পাশ্চাত্যের সুর , তাল , ছন্দের সঙ্গে দেশীয় সঙ্গীতের মিশেলে তৈরি হয়েছিল গান দুটি । কিন্তু এখানেই থেমে থাকেনি রাহুলদেবের গানের তরী। কখনও গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার , কখনও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় বা শচীন ভৌমিক কিম্বা স্বপন চক্রবর্তী অথবা মুকুল দত্ত লিখেছিলেন গানের কথা । নিজের মত করে বিভিন্ন সঙ্গীতধারার আঙ্গিক আত্মীকরণে সুরারোপ করেছিলেন সেই সব রচনায় । তৈরি হয়েছিল “মনে পড়ে রুবি রায় “, ”চোখে চোখে কথা বল “, “ সে তো এলো না” , “যেতে দাও আমায় ডেকো না”, “ ফিরে এস অনুরাধা”, “ফুলে গন্ধ নেই” , “মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো”, ‘ কথা দিয়ে এলে না”, “সন্ধ্যা বেলায় তুমি আমি বসে আছি দুজনে”, “পোড়া বাঁশি শুনলে”, “কিনে দে রেশমি চুড়ি “, “আকাশ কেন ডাকে”, “যেতে যেতে পথে হল দেরী”– এরকম অসংখ্য গান যা কালের অতিক্রমণেও হারিয়ে যায় নি বাঙালি শ্রোতার মন থেকে ।
বাঙলা আধুনিক গানের জগতে রাহুলদেবের এসে পড়বার পিছনে যে পরোক্ষ হাত ছিল শচীন দেব বর্মণের সেটা তর্কাতীত । ১৯৬৫ সাল অবধি শচীন দেব বাঙলা আধুনিক রেকর্ড করেছেন স্ত্রী মীরা দেব বর্মণের রচনায় , নিজের সুরে । কিন্তু তারপরেই ১৯৬৬ সাল থেকে দেখা যাচ্ছে তিনি আর গান রেকর্ড করছেন না । হয়ত মানসিক বা শারীরিক বা উভয় কারণেই খানিক পর্যুদস্ত । ছেলে রাহুলদেব ঠিক এই সময়েই বাঙলা গানের জগতে পা রাখলেন । আসলে সঙ্গীতের যে আবহে বড় হয়েছিলেন রাহুলদেব তার প্রেক্ষিতে কলকাতায় তাঁর সুরকার বা গায়ক হিসেবে পদার্পণ মোটেই অস্বাভাবিক নয় । তাছাড়া এই শহর তো তাঁর একান্ত আপনার – এ শহর জানে তাঁর প্রথম সব কিছুই !
কিন্তু এ শহর যা জানত না – তাই একদিন তিনি নিজেই জানান দিলেন কলকাতার এক রেকর্ডিং রুমের অন্দরে । প্রয়াণের ঠিক একবছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর দুটি বাঙলা এ্যালবাম যার মধ্যে অন্যতম ইন্দ্রানী সেনের কণ্ঠে “সুরে সুরে জাল বোনা” । এ্যালবামটির রেকর্ডিং এর স্মৃতি এখনও খানিক থেকে গেছে ইন্দ্রানী সেনের মনে । প্রথমে কথা ছিল মুম্বাইতে হবে রেকর্ডিং । কিন্তু অজানা , অচেনা শহরে মন সায় দেয় নি যেতে , তাই রাহুল দেব বর্মণ নিজেই পৌঁছে গিয়েছিলেন কলকাতায় । ইন্দ্রাণীর এ্যালবামে বেশ কিছু গান পুরোন হিন্দি গানের সুর বাংলা কথায় গাওয়া যার গীতিকার ছিলেন সঞ্জয় চক্রবর্তী এবং শ্যামল সে্নগুপ্ত । দুটো গানে ছিল নতুন সুর । এবং এই এ্যালবামটির দুটি ভারসান প্রকাশ করেছিল কনকর্ড রেকর্ডস । দ্বিতীয় ভারসানটি প্রকাশিত হয় রাহুলদেব চলে যাওয়ার পরে । এর মধ্যে যুক্ত হয়েছিল একটি নতুন ট্র্যাক যেখানে ইন্দ্রাণীকে গান গেয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনি নিজে !
নিপাট ভদ্র মানুষ আর ডি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইন্দ্রাণী বলেছেন , স্টুডিওর দরজা ঠেলে ঢুকলেন মানুষটি – তসরের পাঞ্জাবী গায়ে – সামনে এসে করজোড় করে বললেন , ‘আমার নাম রাহুল দেব বর্মণ’। ওঁর মতো অত বড় এবং জনপ্রিয় একজন শিল্পী এত বিনয়ের সঙ্গে নিজের পরিচয় দিচ্ছেন – অকল্পনীয় !! তারপর গানের রেকর্ডিং শুরু হল। ইন্দ্রানীর গানের খুব তারিফ করলেন। খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন বাকি শিল্পীদেরও। ভীষণ ভদ্রলোক ছিলেন। যেখানে সংশোধন করা একান্ত প্রয়োজন ছিল তা করলেন। নিজে পারকাশন বাজিয়ে দেখালেন, বোঝালেন। এত দ্রুত বাজিয়েছিলেন দেখে থ হয়ে গেল সবাই। আর তারিফ করবার ভাষা তাঁর একটিই “ফার্স্ট ক্লাস” !
স্টুডিও ছাড়বার আগে বলেছিলেন , এখন তো আর আমার সেরকম নাম নেই – এখন সবাই ভাবে আমি ফ্লপ মাস্টার , আমার গান করা ছবি তো আর খুব একটা হিট করেনা – তা যদি আপনি কখনও আসেন আমি আরেকবার চেষ্টা করব …
সেই সুযোগ আর আসেনি । ১৯৯৪ সালের ৪ঠা জানুয়ারি ভোর রাতে চলে যান রাহুলদেব । একটা লম্বা সময় প্রায় নির্বাসিত ছিলেন কাজের জগৎ থেকে । শিল্পীর কাছে তাঁর সৃষ্টিই সবচেয়ে বড় জিনিস , তাঁর প্রাণবায়ু । ইন্দ্রানী সেনের জন্য তৈরি করা এই গানগুলো আজও বেঁচে আছে সেই দুঃখদিনের ইতিহাস বুকে করে , হিন্দি ছবির ক্ষেত্রে রাহুলদেবের শেষ কাজ “ ১৯৪২ – এ লাভ স্টোরি” –র থেকে যার মূল্য কোন অংশে কম নয় !
What's Your Reaction?
Saptarshi, a finance professional, has a camaraderie with his camera and pen as he tries to capture the wonderful light and sight along his way and write about the world and people around him.
