Now Reading
অস্তিত্ব

অস্তিত্ব

Avatar photo
অস্তিত্ব

অস্তিত্ব একটি ছোট গল্প, যেখানে হাস্যরস, অতিপ্রাকৃত ঘটনা এবং জীবনের সংগ্রামের মিশ্রণে উঠে এসেছে এক তরুণের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই এবং জীবনে নতুন দিশা খোঁজার গল্প।

‘অস্তিত্ব’ খুব ছোট একটি  শব্দ, কিন্তু এই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে আমরা সবাই ক্লান্ত। এমনই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই এর একটি মজার গল্প- রাজা মিত্তির বাড়ির কেয়ারটেকারের ছেলে! উত্তর কলকাতার মিত্তির বাড়ি! মিত্তির বাড়ির সবাই জমিদার বংশ, তারা নিজেদের ঐশ্বর্য আধিপত্য সবই অ ক্ষুন্ন রেখে চলেছে অনেক বছর ধরে, কিন্তু জমিদার বাড়ির তিন ছেলের মধ্যে- বড় ছেলে নগেন মিত্তির এবং মেজো ছেলে হীরেন মিত্তিরের মৃত্যুর পর তাদের ছোট ভাই তথা মিত্তির বাড়ির ছোট ছেলে বীরেন মিত্তিরের এতদিন জীবিত থাকায় সেই জমিদার বাড়ির ঐতিহ্য বহন করে চলছিলেন। গত দু’বছর হলো বীরের মিত্তির ও পরলোক গমন করায় আজ মিত্তির বাড়ির অস্তিত্ব বিলুপ্তির পথে প্রায়।
মিত্তির বাড়ির কেয়ারটেকার ছিলেন মনোজ বাবু। মনোজ ব্যানার্জি। তারই ছেলে রাজা ব্যানার্জি। মনোজ বাবু মারা যাবার পর রাজার চারিদিকে ধার দেনায় জর্জরিত। রাজা ,উচ্চ- মাধ্যমিক পাশ দেবার পর আর পড়াশোনা করেনা, ভাবে -ব্যবসা-বাণিজ্য করে অনেক নাম করবে। কিন্তু বড় হওয়ার স্বপ্নটা স্বপ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইল। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য কঠিন পরিশ্রম না করলেও সেই স্বপ্নের কথা প্রচার করতে করতে বিভিন্ন জায়গায় ঋণ নিয়ে ফেলল সে। জমিদার বাড়ির সাথে যোগাযোগের ভিত্তিতে ঋণও পেতে কোন অসুবিধা হলো না।
এইভাবে বছর যায়, মাস যায় ,কিন্তু রাজা কিছু করতেও পারে না আর ঋণ ও শোধ করতে পারে না। বাড়িতে বিধবা মা আর রাজা এই দুজনের সংসার। ঋণ শোধ করতে না পারায় সুদ আর আসল মিলিয়ে বেশ অনেকগুলো টাকাই জমে গেল। সকালের ঘুম আর রাতের খাওয়া দুটোই যেন রাজার জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়ার জোগাড়। সকালে ঘুম থেকে উঠতেই পাওনাদারের তারা আবার অতিরিক্ত মদ্য পান করার দরুন এতটাই অস্বাভাবিক অবস্থা হয়ে পরতো যে রাতে খাবার মত পরিস্থিতি থাকতো না। সুন্দর চেহারাটাও শুকিয়ে একেবারে হাড় গিরগিরে হয়ে গিয়েছে। এইভাবেই রোজ দিন কাটছে।
সেদিন রাজা একটু বেশি মদ্যপান করেছিল। বাড়ি যাবার পথে একটি গ্রেভিয়ার্ড পড়ে রোজই, সেখান দিয়েই রোজ রাজা বাড়ি ফেরে, কিন্তু সেদিন রাজা বাড়ি না ফিরে গ্রেভিয়ার্ড-এ ঢুকে পড়ে। স্বাভাবিক অবস্থায় না থাকার দরুন একটি কবরের উপর বসে সে বিড়বিড় করতে থাকে-“ধুর শালা! বাড়িতে এত ঝামেলা, পাওনাদারের তাড়া । আমি আর বাড়ি ফিরবই না। মা-ও খ্যাচ খ্যাচ করে  জীবনটা ধনেপাতা হয়ে গেল।” এই বলতে বলতে হাত পা ছুড়ে বিলাপ করতে থাকে। এদিকে যার কবরের উপর বসে রাজা বিড়বিড় করছিল সেই কবর থেকে ভূত উঠে লম্বা হয়ে রাজার পেছনে দাঁড়িয়ে রাজার পিঠে হাত দিয়ে ডাকতে থাকে। রাজার বোধগম্য কাজ না করায় বুঝতে না পেরে নিজের কাছ থেকে ভুতের হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলে’-‘উফ! বিরক্ত করিস না তো! ‘ কিন্তু কার উদ্দেশ্যে বলছে সেটা বুঝতেও পারেনা। এদিকে কবরের ভূতকে পাত্তা না দেওয়ায় সে তো বেজায় রেগে গেল। সাথে সাথে নিজের অস্তিত্ব তো ক্ষুন্ন হয়েই ছিল তাও সবাই ভয় পেত বলে কবরের ভুতের একটা গর্ব ছিল, কিন্তু এ তো ভয়েই পাচ্ছেনা! তাই কবরের ভুতের খুব রাগ হলো। রাজার সামনে এসে এবার সে সটাং লম্বা হয়ে দেখা দিল।
বলা বাহুল্য রাজার তখনও ঠিক হোস ফিরল না, রাজা কবরের ভূত কি নিজের যন্ত্রণার কথা বলতে থাকে আর তার বাড়ি না ফেরার কথাও বলতে থাকে। কবরের ভূতের রাজা কে দেখে ভারি দয়া হলো, তখন কবরের সেই ভূত রাজাকে একটি বর দিল। ভূত বলল-‘ তুই বাড়ি যা! খুব শীঘ্রই তোর জীবনে একটি মেয়ে আসবে, যার বা হাতে সাতটা আঙুল থাকবে, সে ই তোর জীবনের সব দুঃখ কষ্ট দূর করবে, আর তার হাত ধরে তুই যাই চাইবি তাই পাবি।’
এ দুদিন পর রাজা পটলাদার চায়ের দোকানে চা খাচ্ছে,আর ভূতের সেই বরের কথা ভাবছে- দুদিন হয়ে গেল এরকম মেয়ে তো কোথাও দেখা নেই! রাজা মনে করতে পারছে না, কবরের সেই ভূত কি সত্যিই বর দিয়েছিল না সেটা রাজার দেখা কোন দিবা স্বপ্ন ছিল! হঠাৎই একটি মেয়ে চায়ের দোকানে চা খেতে এল, উল্টোদিকের বেঞ্চটায় বসে। সেই ভূতের বরের কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ রাজার মেয়েটার দিকে চোখ গেল। সুন্দরী ,ছিমছাম একটি মেয়ে, ডানহাতে চায়ের ভাঁড়টি তে চুমুক দিচ্ছে আর বাঁ হাত দিয়ে বিস্কিট কামড়াচ্ছে, বাঁ হাতের আঙুল খেয়াল করতেই রাজা দেখলো- মেয়েটির বুড়ো আঙ্গুলের পাশে আরো দুটি আঙ্গুল। রাজা ২ সেকেন্ডের মধ্যে এক পলকে তাকিয়ে গুনে নিল সাত টি আঙুল! অমনি রাজা মেয়েটির হাত ধরে বলতে লাগলো- আমায় বাঁচান ! আমার বড় বিপদ! শুরুটা এভাবে করেছিল রাজা কিন্তু নিজের সব কথাই অবলীলা ক্রমে মেয়েটিকে বলে ফেলে রাজা। মেয়েটির প্রচুর ঐশ্বর্য কিন্তু বাবা-মা কেউই নেই, সে একা জীবনে চলার পথে একজন পথিক সে খুঁজছিল অনেকদিন ধরে, রাজার কথাবার্তা শুনে, আলাপ করে মেয়েটির মনে হল ,এই রাজারই রানী হতে চায় সে। ভূতের বর কাজে এসে গেল! রাজা ও রানী পেয়ে গেল। সমস্ত ঋণ শোধ করে রাজা একটি ছোট ব্যবসা শুরু করল। ভালোভাবে দিন কাটতে লাগলো। আনন্দে কবরের সে ভূতকে মিষ্টি ও খাইয়ে এলো রাজা। ভূতের সেই কবরের উপর একটি বেদী তৈরি করল রাজা, আর তাতে বড় বড় অক্ষরে লিখে দিল—” কর্মের মধ্যে দিয়ে অস্তিত্ব মৃত্যুর পরেও অখুন্ন থাকে।”

What's Your Reaction?
Excited
1
Happy
0
In Love
1
Not Sure
0
Silly
0
View Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published.


Scroll To Top