খ্যাতির বিড়ম্বনা
Born, raised, and educated in Kolkata, she studied at Patha…
খ্যাতি এলে বিড়ম্বনা আসতে বাধ্য আর সে খ্যাতির নাম যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়। সেইসব বিড়ম্বনা কখনো হাজির হয়েছে সশরীরে আবার কখনো বা চিঠির মাধ্যমে।কখনো অকারণ গুজব ছড়িয়েছে তাঁর নামে।তিনি বিচলিত হয়েছেন, কষ্ট পেয়েছেন,আবার সামলেও নিয়েছেন। আবার এই বিড়ম্বনার পথ বেয়েই হেমন্তবালার চিঠি এসে পড়েছে কবির চৌকাঠে। রবীন্দ্রনাথের জীবনের এমনই কিছু বিড়ম্বনার কথা রয়েছে এই লেখায়।
খ্যাতি এলে তার সঙ্গে সঙ্গে বিড়ম্বনা আসতে বাধ্য। আর সে খ্যাতির নাম যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়, তাহলে বিড়ম্বনাও তো পর্বত প্রমাণ।
গুরুদেব নিজেই রাণী চন্দকে বলেছেন : “যে সমস্ত কাজে,অকাজে এতকাল জড়িত বিজড়িত ছিলুম,তার জাল কেটে একেবারে ফাঁকায় বেরিয়ে পড়বার জন্য চিত্ত উৎকন্ঠিত। কিন্তু খবরের কাগজওয়ালা মেসেজ চায়,কবি চায় অভিমত,জননী চায় কন্যার নাম,মুসলমান চায় তাদের প্রভুর নামে স্তবগান,মাদ্রাজী গ্রন্থকর্তারা চায় তাদের গ্রন্থের ভূমিকা,ডাকযোগে পত্র আসছে প্রত্যুত্তরের প্রত্যাশায়,মাসিকপত্র গদ্যে পদ্যে রসদের নিয়মিত বরাদ্দ দাবি করে,পাতানো নাতনীরা অভিমান করে,সুধীর কর আসেন পা টিপে টিপে প্রুফ নিয়ে,নানা প্রস্তাব নিয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। এ হল আমার বড়ো হবার শাস্তি। বেশ ছিলেম পদ্মার তীরে তীরে নদীর স্রোতে। সহজ আনন্দের দিন ছিল তখন।সেইদিন কি আর ফিরে পাব? ”
কবি যতই চান সেই সব বিড়ম্বনার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে,তা কি হওয়ার জো আছে? তাই খ্যাতি যত বেড়েছে বিড়ম্বনাও বেড়েছে ততোধিক।
কখনো সে বিড়ম্বনা এসেছে চিঠির মাধ্যমে আবার কখনো হাজির হয়েছে সশরীরে।
রবীন্দ্রনাথের জীবন জুড়ে চিঠি এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর লেখা অজস্র চিঠির আজও হদিস পাওয়া যায় না। অথচ এই এক একটা চিঠি রবীন্দ্র সাহিত্যের এক একটা স্তম্ভ। তাঁর লেখা চিঠি না পড়লে বোধহয় তাঁকে জানা সিংহভাগ অধরাই থেকে যায়। তাঁর জীবন, যাপন, উপলব্ধি,অনুভূতি সব লুকিয়ে আছে ওই পাহাড় প্রমাণ চিঠিতে। আর যেসব চিঠি আসত রবীন্দ্রনাথের কাছে?শুধুই কি চিঠি? এত চিঠি, এত পার্সেল, এত বই আর এত সাময়িক পত্রিকা আসত যে, তাঁর জন্যেই একটা গোটা ডাকঘর রাখা সম্ভব ছিল। এই যে এত অসংখ্য চিঠি পেতেন তিনি তাতে যেমন ছিল আপনজনদের চিঠি, স্নেহের মানুষের চিঠি, ছিল জ্ঞানী গুণী সম্ভ্রান্ত, সম্মানীয় মানুষদের চিঠি, তেমনই ছিল নানারকম অদ্ভুত কিম্ভুত চিঠি।আর এই অদ্ভুত কিম্ভুত চিঠির সংখ্যাও ছিল অগণিত। এত এমন অদ্ভুত সব চিঠির উত্তর গুরুদেবকে দিতে হলে, তাঁর যে কতটা মস্তিষ্ক বিভ্রাট ঘটত সেটা ভাবলেও আঁতকে উঠতে হয়। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার পর এই ধরনের চিঠির আসা আরো বেড়ে যায়। কত বিচিত্র সব আবদার, কত দাবি দাওয়া, আবার কখনো বা প্রেম নিবেদন নিয়ে আসত সেই সব চিঠি। ১৯৩৩ সালে, অনিলকুমার চন্দ কবির প্রাইভেট সেক্রেটারি হওয়ার পর এইসব চিঠিগুলো উনি সংগ্রহ করে রাখতে শুরু করেন। অনিলকুমার চন্দ ও সুধীরচন্দ্র করের দূরদর্শিতায় ১৯৩৩ থেকে ১৯৪১ সাল অব্দি কয়েক হাজার চিঠি জড়ো হয় ওঁর সংগ্রহে।

অনিলকুমার চন্দ এই চিঠিগুলোর নাম দিয়েছিলেন, ‘ছিটগ্রস্ত লোকেদের অবান্তর ফাইল’,চলতি কথায় বলা হত ‘ পাগলা ফাইল’।তা এই ফাইলের এ হেন নাম কেন সেই নিদর্শন তো কয়েকটা রাখা দরকার :
এই চিঠিগুলির জবাব কবি নিজে না দিলেও, তাঁর সচিবরা যে এই চিঠিগুলি পড়েছেন ও কখনো কখনো কোনো কোনো চিঠির সারাংশও কবিকে পড়ে শুনিয়েছেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এবার আসি সেই চিঠিগুলির কথায়।
জেলা মেদিনীপুর, পোঃ নাচিন্দাবাজার,,গ্রাম রানিয়া থেকে জনৈক শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র মান্না লেখেন :
পরম পূজনীয় শ্রীযুক্ত বাবু’,
প্রণাম নিবেদনমিদং মহাশয়, বড় লম্বা সাইজের পেঁপের বীজ বাগানে গাছ করাইবার জন্য অনুগ্রহ করিয়া পাঠাইবেন।আমাদের এ অঞ্চলে ঐ প্রকার পেঁপে অথবা উহার বীজ পাওয়া যায় না। আপনার ওখানে পাওয়া যায় জানিয়া আপনাকে ঐ বীজ কিছু পাঠাইবার জন্য অনুরোধ করিতেছি।আশাকরি আপনি দয়া করিয়া কিছু বীজ ডাকযোগে পাঠাইয়া বাধিত করিবেন। নিবেদন ইতি বিনীত……
পুনশ্চ নিবেদন এই যে,উক্ত বীজ পাঠাইবার ডাক খরচ, ইত্যাদি আমি বহন করিব।
ভাগ্যিস তিনি খরচ বহন করতে চেয়েছিলেন! নয়তো কবির কি যে হত! এ হেন মানুষ কেনই বা কবিকে পেঁপে বিশারদ ভেবেছিলেন, কে জানে? পত্রদাতা হয় অসম্ভব সরল নয়তো অপ্রকৃতিস্থ।
এমন আরো অসংখ্য চিঠি আসত কবির কাছে। কেউ জানতে চেয়েছেন তাঁর নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার টেকনিক, কেউ বা জানতে চেয়েছেন তাঁদের হাতে লেখা পত্রিকায় কবি তাঁর লেখা ছাপাতে চান কিনা। তাহলে যেন সত্বর সে লেখা পাঠানো হয়। আবার কেউ বা জানিয়েছেন তিনি বাল্য বিবাহের শিকার। তাঁর বালিকা পত্নীকে তালাক দিয়ে আর একখানা বিবাহ করবেন কিনা তার পরামর্শ চেয়েছেন। এক মহিলা তো খামে করে একগোছা সোনালি চুল পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি জনৈকা পর্তুগীজ মহিলা,নাম মারিয়া এলিজা দ্য কামপোজ আলবুকার্কি।নিবাস – লিসবন পর্তুগাল। উদ্ধার করা কি আর সম্ভব?যিনি এ ভাষা জানেন তিনি হয়তো বুঝবেন। চিঠিটা এইরকম : Senor pedia a V.O.favor de me enviar rue horoscopio O she muni to agradee.এই চিঠিটার আর এক উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, ওই মহিলা কবির ঠিকানা দিয়েছিলেন ওমরখৈয়াম স্ট্রিট, ৩৫ হায়দরাবাদ। অনেক ঠিকানা ঘুরে তবে এ চিঠি শান্তিনিকেতনে এসে পৌঁছয়।
এক সাংঘাতিক চিঠির কথা না বললেই নয়। এক মহিলা বহরমপুর থেকে কবিকে লিখেছিলেন এই চিঠি :-
প্রিয়তম নাথ, তোমার চিঠি পেয়েছি। এতদিন পরে যে এ দুঃখিনীর কথা মনে করেছ, এই আমার সৌভাগ্য। তবে আবার রাগ করব কেন?আমার দিনগুলো যে কিভাবে কাটছে,তা যদি তুমি এতটুকুও বুঝতে পারতে,তাহলে একখানা পত্র লিখতে, এত দেরি করতে না।যাক,তোমার শরীর আজকাল কেমন আছে?এ বাড়ির সব ভাল আছে।তোমার ছেলে ভালই আছে।তুমি আমার প্রাণভরা ভালবাসা জেনো।চুমো দিয়ে বিদায় নিচ্ছি।
ইতি
তোমারি সুবাস।
এ হেন চিঠির লেখিকার মানসিক স্থিতি নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে কি?
১৯ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট থেকে ১৪ই জৈষ্ঠ্য, ১৩৩২ তারিখে ছোট্ট একখানা চিঠি আসে : রবীন্দ্রনাথ, আমার ব্যথায় কে? ইতি শ্রী বেচারাম দত্ত। একজন তো আবার কবিকে জ্যোতিষীও ভেবে বসেছিলেন।
এমন আরো যে কতশত অদ্ভুত চিঠি আসত তার ইয়ত্তা নেই। কেউ কবিতা সংশোধন করে দিতে বলত আবার কেউ সাহায্য চেয়ে চিঠি লিখত। তবে অনেক সাহায্যের চিঠিতেই পাশে ছোট্ট একটা নোট লিখে দিতেন কবি, অনিল জানাবে। অর্থাৎ অনিল চন্দ কবির কথামত যেটা করবার করবেন।
তবে শুধু কি আর চিঠি! সশরীরেও হাজির হত সে সব বিড়ম্বনা।
রাণী চন্দ ‘ গুরুদেব’ বইয়ে লিখেছেন : “একবার এক মান্যগণ্য বিচিত্র ভদ্রলোক এলেন সস্ত্রীক। গুরুদেবের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে,ভদ্রমহিলাও বুঝি ভাবলেন কিছু একটা বলা উচিত,তাঁদের কথার মধ্যে হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘ আচ্ছা রবিবাবু, আপনি এখনও কবিতা টবিতা লেখেন’?আমরা তো শুনে থ!গুরুদেব একটু হকচকিয়ে গেলেন।পরমুহূর্তেই সামলে নিয়ে গম্ভীর মুখে নিমীলিত নেত্রে বললেন,’ তা হ্যাঁ – এখনও একটু লিখি বৈকি!’আর একটি ঘটনার কথা বলি :
কবি তখন জোড়াসাঁকোয়।
এক ভদ্রলোক তাঁর সমস্যা নিয়ে হাজির কবির কাছে। তাঁর দশখানা লুচিতে পেট ভ’রে যায় অথচ তাঁর স্ত্রী তাঁকে পনেরোখানা লুচি খাওয়াবেনই। তিনি শুনেছেন এই বাড়িতে নানারকম সমস্যার সমাধান হয় তাই চলে এসেছেন। কবি মুচকি হেসে বললেন, “ঠিকই শুনেছেন,ঠিক বাড়িতেই এসেছেন, তবে ঘরটা ভুল হয়ে গেছে। আপনি সিঁড়ি বেয়ে ডান দিকে গেলেই এক বিরাট বৈঠকখানা দেখতে পাবেন।সেখানে গোঁফওয়ালা এক ভদ্রলোক ( দ্বিপুবাবু – দ্বিপেন্দ্রনাথ ঠাকুর , দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সন্তান ) বসে আছেন, তাঁকে বলুন, তিনিই আপনাদের মত লোকদের নাড়াচাড়া করেন, তিনি আপনার সমস্যার সমাধান করে দেবেন।“
একবার একজন কিছুতেই কবিকে ছাড়ে না। অথচ কি যে তার বলবার কথা সে জানে না। কবি যতবারই লেখায় মন দিতে চান, বাধা পান। অথচ তিনি লেখার জন্য ব্যাকুল। করুণ হয়ে উঠেছে তাঁর মুখখানা। সেইদিন সন্ধ্যেবেলা দুঃখ করে কবি বললেন,” সবারই সময় অসময় আছে,নেই কেবল আমারই। আমার নিজের বলে দিনের একটুখানি সময়ও আমি পাই নে কখনো।“ খ্যাতির বিড়ম্বনা কিভাবে কবিকে জর্জরিত করেছিল, তার আরো একটা উদাহরণ হল :৬ই সেপ্টেম্বর ১৯২৭ এ ‘’সিলোন ডেইলি নিউজ ‘ নামে এক ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্র এক খবর রটিয়ে দিল রবীন্দ্রনাথের নামে যে, রবীন্দ্রনাথ নাকি পোর্তুগিজ বংশের সন্তান। তাঁর পঞ্চম পূর্বপুরুষ ছিলেন পোর্তুগিজ আর এ কথা কবি নাকি নিজে ওই পত্রিকার এক সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বলেছেন।এমন ডাহা মিথ্যে কিভাবে ছেপে বেরোলো কে জানে? তবে ১৯৩৪ এর ‘’ প্রবাসী’ পত্রিকার কার্তিক সংখ্যায় মন্তব্য করা হয়েছিল – “এই অদ্ভুত গাঁজাখুরি কথার, উৎপত্তি কি প্রকারে হইল,বলিতে পারিনা।”

কিন্তু খ্যাতি কি কেবল বিড়ম্বনাই এনেছিল কবির জীবনে?অসমবয়সী মিষ্টি বন্ধুত্বও তো এনেছিল। খদ্যোৎবালা, জোনাকি,এমন বিভিন্ন ছদ্মনামে হেমন্তবালার চিঠি আসত কবির কাছে, যা কিনা কোনো কারণে বন্দী হয়ে পড়েছিল সেই ‘পাগলা ফাইলে’। কিন্তু কিভাবে যেন সেই ফাইলের ভেতর থেকে চিঠি এসে পড়ল স্বয়ং কবির হাতে। এরপর এল সেই দিনটি। ১৯৩১ এর ৮ই ফেব্রুয়ারি।রাজার চিঠির মত কবির চিঠি এসে পৌঁছল হেমন্তবালার কাছে। প্রথম প্রথম পরিচয় গোপন করলেও, কবির আন্তরিকতায়, পরিচয় প্রকাশ করেন হেমন্তবালা। হেমন্তবালার লেখনীর জাদুতে আকৃষ্ট হন কবি। দেখা সাক্ষাৎ ও হয় দুজনের।পেয়েছেন একে অপরের সান্নিধ্য।সম্মানে,স্নেহে, মুগ্ধতায়, আচ্ছন্ন হয়ে ছিলেন তাঁরা। খ্যাতি না থাকলে তো এই বিড়ম্বনাও আসত না কবির জীবনে। আর বিড়ম্বনার পথ বেয়ে এমন অক্ষরে সখ্যও গড়ে উঠত না। তাই খ্যাতিও থাক, আর থাক বিড়ম্বনা। আমরা কেবল তার থেকে ভালটুকু নিই
মনপ্রাণ ভ’রে।
What's Your Reaction?
Born, raised, and educated in Kolkata, she studied at Patha Bhavan and pursued music at Rabindra Bharati University. Her profession and passion revolve around advertising, music, and literature. Her days unfold beautifully through singing, writing, exploring Kolkata, observing people, and dreaming. Her published poems and stories showcase her work as a lyricist and playwright, defining her vibrant world.
