Now Reading
শেফালী দিদির স্মরণে লেখিকা পূরবী সেনের আবেগঘন স্মৃতিচারণ

শেফালী দিদির স্মরণে লেখিকা পূরবী সেনের আবেগঘন স্মৃতিচারণ

Avatar photo
Shefali Didi শেফালী দিদি

পরম শ্রদ্ধেয়া শেফালী দিদির অকৃত্রিম ভালোবাসা ও বিদায়ের এক আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেছেন লেখিকা পূরবী সেন। দিদির আকস্মিক প্রয়াণে তৈরি হওয়া গভীর শূন্যতা, তাঁর বহুমুখী গুণাবলী এবং অন্তহীন স্নেহের অমলিন স্মৃতিকে পরম মমতায় এই রচনায় ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।

আমার প্রাণের দিদি, বন্ধু, মিতা—শেফালী দিদি।

স্মৃতির পাতায় যে কত সযতনে তাঁকে তুলে রেখেছিলাম, তা আজ তাঁকে চিরতরে হারিয়ে যেন আবার নতুন করে বুঝতে পারছি।

অনেক দিন থেকেই অসুস্থ শরীরের বোঝা টেনে টেনে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন তিনি। তবু পরিবারকেন্দ্রিক মন তাঁর সবার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মাঝেই এক অসীম তৃপ্তি খুঁজে পেত, খুঁজে পেত বেঁচে থাকার রসদ। একমাত্র সন্তান চয়নকে নিয়ে তাঁর অন্ধ আকর্ষণ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু অবাক লাগত যখন দেখতে পেতাম সবার প্রতিই তাঁর সমান দৃষ্টি রয়েছে, সবার ভালোমন্দের সাথে তিনি নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। নন্দিনীর বৈবাহিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আমার সাথে তাঁর পরিচয়, কিন্তু মনে হতো অনাদিকাল থেকেই যেন তাঁর সাথে আমার ওঠাবসা! এক মুখ অনাবিল হাসি নিয়ে আমার মতোই সব্বাইকে তিনি আপ্যায়ন করতেন। কোনো স্বার্থের গন্ধ ছিল না, ছিল না কোনো অভিনয়—সেই অকৃত্রিম ভালোবাসায়।

আমি তো সাধারণত একলাই এই শহরে চলাফেরা করি, তাই উনার বাড়ি থেকে আমার বাড়ি পৌঁছানো মাত্রই খোঁজ নিতেন আমার পৌঁছানোর সংবাদের। আজও মনে পড়ে, সেদিন বিকেলবেলা ফিরে আসার ঠিক আগে যখন উনার কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলাম, বারবার বললেন, “আজকের দিনটি থেকেই যান না পূরবীদি।” উত্তরে বলেছিলাম, “এই তো আসা-যাওয়ার তো আমার শেষ নেই শেফালী দিদি আপনার বাড়িতে। তাই খুব শীঘ্রই আবার আসবো, খারাপ পাবেন না।” আমি যখন উনাদের সদর দরজাটি পেরিয়ে লিফটে উঠে গেছি, আর করবী রা আমাকে ‘বাই’ বলছিল, হঠাৎ তাকিয়ে দেখি পেছনে এসে উনিও দাঁড়িয়েছেন। দুটি শীর্ণ হাত তুলে নীরবে বিদায় জানাচ্ছেন আর বলছেন, “আবার আসবেন শীঘ্রই।”

লেখিকা পূরবী সেন ও তাঁর ছোট বোন তাঁদের প্রিয় শেফালী দিদির সঙ্গে।
লেখিকা পূরবী সেন ও তাঁর ছোট বোন তাঁদের প্রিয় শেফালী দিদির সঙ্গে।

হ্যাঁ শেফালী দিদি, আমি আপনার আমন্ত্রণ ফেলতে পারিনি। খুবই শীঘ্রই ফিরে গিয়েছিলাম, ঠিক তিন দিনের মাথায়—১১ই জুন। কিন্তু আপনি তখন আর আমাকে স্বাগত জানানোর জন্য বসে নেই। সেদিন আমার সেই আকুল কান্নার আওয়াজ যতটুকু তীব্র ছিল, আজ তা শব্দহীন ফল্গু নদী হয়ে আমার অন্তরের গভীরে সমাহিত; এটুকুই যা তারতম্য! সেদিন যখন আচমকাই উনার জীবনবাতি নিভে গেল, যারাই ছুটে এসেছিলেন, সবার সাথেই ছিল তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের এক অপূর্ব সমীকরণ।

এত গুণী মানুষ ছিলেন আপনি! আপনার হাতের লেখার অপূর্ব সুন্দর রম্যরচনা, সুরেলা কণ্ঠের গান কিংবা গুছোনো স্বভাবের নিদর্শন—এসব এখন আমার স্মৃতির পর্দায় প্রতিটি অবসর মুহূর্তে যেন চলচ্চিত্রের মতো ভেসে বেড়ায়। আর ভাবি, নিত্যদিনের ব্যবহারে আমরা সবাই একে অন্যের কাছে কত না পুরনো হয়ে যাই; আর একটা দিন আসে যখন আবার ফিরে পেতে চাই, তখন আকাশ-বাতাস থেকে একটাই ধ্বনি ভেসে আসে—”নাই, নাই, নাই!”

আপনার বিহনে আপনার প্রাণপ্রিয় চয়ন আজ মুখরতা হারিয়ে নিজের মধ্যেই যেন সমাধিস্থ। তেমনই আপনার মামণি বা নাতনিরাও হারিয়েছে ওদের জীবনছন্দ। আমার ছেলেও যে আপনার ভালোবাসায় এতটা আপ্লুত হয়েছিল, তা সেদিন ওর ক্রন্দসী মুখখানি দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম। সত্যিই আপনি অনন্যা ছিলেন শেফালী দিদি, নিজের নামটিকেও সার্থক করে গেছেন। এর সৌরভ কোনোদিনও কেউ বিস্মৃত হতে পারবে না।

জানি না আপনি আজ কালের মহাগর্ভে কোথায় থিতু হয়েছেন বিষ্ণুলোকে, কিন্তু আপনার এই হঠাৎ করে পরম বিষ্ণুপাদপদ্মে বিলীন হয়ে যাওয়াটা আমরা যেন কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছি না। আজ তোমায় হারিয়ে নিজেকে বড্ড একা মনে হচ্ছে, শেফালী দিদি। এই বাড়িটিও যেন ক্রন্দসী হয়ে আছে তোমার বিহনে।

See Also
Zubeen Garg by Apurba Rajbongshi

ভালো থেকো দিদি আমার। আবার দেখা হবে তোমাতে-আমাতে অন্য কোনোখানে, অন্য কোনো রূপে—হয়তো বা গাঙচিল, হয়তো বা দোয়েল, কিংবা পথিকের বেশে! পূর্ণ প্রাণের মেলায় তখন আবার আমরা নতুন করে নিজেদের ভাসিয়ে দিয়ে বাঁচবো কোনো বসন্ত সমাগমে, এই নিখিল ভুবনে।

ভালো থেকো শেফালী দিদি অমৃতলোকে, সত্য-সুন্দরের চরণপ্রান্তে, নব অবয়বে, নব মহিমায় উদ্ভাসিতা হয়ে।

শুভ বিদায়।

What's Your Reaction?
Excited
0
Happy
1
In Love
1
Not Sure
0
Silly
0
View Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll To Top