Now Reading
দেবী তো “ভোগ”-এ তুষ্ট হলেন; দর্শক হলো কি?

দেবী তো “ভোগ”-এ তুষ্ট হলেন; দর্শক হলো কি?

Avatar photo
দেবী তো "ভোগ"-এ তুষ্ট হলেন; দর্শক হলো কি?

“ভোগ” সিরিজ নিয়ে একটি সমালোচনামূলক পর্যালোচনা, যেখানে বিশ্লেষণ করা হয়েছে অভীক সরকারের জনপ্রিয় গল্পের উপর ভিত্তি করে নির্মিত সিরিজের চিত্রনাট্য, পরিচালনা, অভিনয়, এবং টেকনিক্যাল দিক। হরর প্রেমীদের জন্য এটি একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ নির্ভর রিভিউ।

“ভোগ” এর প্রচারমূলক আর্টিকেল এর আগেও আমাদের পেইজে পাবলিশ হয়েছে পড়ে দেখতে পারেন।
(মতামত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত, দর্শকদের অনুরোধ আপনারা সিরিজ দেখুন, তারপরে রিভিউ পড়ুন)
গল্প- “ভোগ” একটি অতি জনপ্রিয় গল্প, লেখক অভীক সরকারের মুন্সিয়ানা, তাঁর “এবং ইনক্যুইজিশন” বইটির অন্তর্গত এই গল্পটি নিয়ে এর আগেই জনপ্রিয় বেতার চ্যানেল থেকে অডিও স্টোরি হয়েছে। এবং সেই গল্পের জনপ্রিয়তা ও আকাশ ছোঁয়া। আজ থেকে বেশ কিছু বছর আগে আমি “ভোগ” গল্পটি পড়ি এবং পড়ার সাথে সাথে সেই গা ছমছমে অনুভূতি বেশ কিছু সময় আমার সঙ্গে ছিল, এরপরে “ভোগ”-এর অডিও স্টোরিও আমাদের মানে শ্রোতাদের খুবই মনোগ্রাহী হয়েছে। তাই গল্প আপনারা জানেন, তাও ছোট করে বললে- পিতৃ-মাতৃ হীন প্রাইভেট ফার্মে চাকুরীরত এলিজিবল ব্যাচেলর অতীন তার পৈতৃক বাড়িতে থাকে তার মায়ের আমলের কাজের লোক পুষ্পদির সাথে, আর তার লোকাল গার্জিয়ান হল বাবার বন্ধু অকৃতদার ভবেশ কাকা। অতীনের শখ হল পুরনো দুষ্প্রাপ্য জিনিস সংগ্রহ করা, পার্ক স্ট্রিটে তার বন্ধু সুবেশ আগারওয়াল এর কিউরিও-র দোকান থেকে, এখান থেকেই সে একদিন সংগ্রহ করে একটি দেবী মূর্তি। কিন্তু সেটি কোন সাধারণ দেবী মূর্তি নয়, কিছুটা অন্যরকম, বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবীর আদল এই মূর্তিতে দেখতে পাওয়া যায়। এই মূর্তি বাড়িতে আনার পর থেকেই অতীনের মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে.. তারপর একদিন অফিস থেকে ফেরার সময় অতীনের সঙ্গে দেখা হয় পরিবার পরিত্যক্তা একটি মেয়ের সাথে, যার নাম ডামরি। তাকে অতীন তার বাড়িতে নিয়ে আসে, পুষ্পদিকে কাজে সাহায্য করার জন্য.. তারপরে কি হয় সেই ঘটনা প্রবাহ নিয়ে গল্প এবং তারই ওপরে আধারিত এই সিরিজ।

চিত্রনাট্য – গল্পে রসদ থাকলেও চিত্রনাট্য বড্ডই আলগা ও সময় বিশেষে খাপছাড়া। এখানে সিরিজের পর্বগুলো কিন্তু ২৫-৩০ মিনিট এর, যেটা চিত্রনাট্যকে টানটান করার জন্যই কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। কিছু সময় পরে পরে রিপিটেটিভ শট ও অদ্ভুত মেকআপ বিরক্তির উদ্রেক ঘটায়। । পরিচালক সিরিজের প্রয়োজনে গল্পে কিছু কিছু ছোট্ট পরিবর্তন করেছেন, কিন্তু সেগুলোও স্ক্রিনে দেখতে খুব ইন্টারেস্টিং লাগেনা। আর এই সিরিজের vfx এর কাজ গুলি খুবই খারাপ,(হয়তো বাজেট সমস্যা) বিশেষ করে শেষের দিকের একটি এপিসোডে চোখে বড্ড পড়ে। এতে যদিও পরিচালকের দোষ নেই তিনি সীমিত সাধ্যের মধ্যে চেষ্টা করেছেন।

ক্যামেরা, সাউন্ড ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর – হরর জঁরের যেকোনো গল্পে সাউন্ড- ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ও ক্যামেরার কাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বহন করে। ক্যামেরার কাজ কিছু কিছু এপিসোডে ভালো হলেও, হরর গল্পের আবহ তৈরি করতে যে ধরনের সাউন্ড বা ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর লাগে, এই সিরিজের এপিসোড গুলোতে সেগুলো মিসিং এবং বেশিরভাগ জায়গায় ভয়ের আবহ তৈরি করতে ব্যর্থ।

অভিনয় – প্রথমেই বলে রাখা ভালো, এই সিরিজের হাইলাইট পয়েন্ট ছিল ভালো কাস্টিং। বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বড় বড় নাম কিন্তু এখানে রয়েছেন। পুষ্পদির ভূমিকায় সুদীপা বসু ও ভবেশ বাবুর চরিত্রে রজতাভ দত্ত থাকলেও তাদের এখানে বিশেষ কিছু করার ছিল না। তাও তারা সীমিত সময়ে যথাযথ। ছোট্ট কিন্তু বিশেষ চরিত্রে শুভাশিস মুখার্জিকে দেখতে বেশ ভালো লাগে। নাম ভূমিকায় অর্থাৎ অতীনের চরিত্রে অনির্বাণ ভট্টাচার্য ভালো। তার ম্যানারিজম, বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে তার চরিত্রের দুর্বলতা, ভয়- ভক্তি- ভালবাসা তিনি ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন। ডামরির চরিত্রে পার্ণো মিত্র সম্পূর্ণ মিসকাস্টিং। পার্ণো, একজন ভালো অভিনেত্রী, তার পূর্ববর্তী বেশকিছু কাজ আমার খুবই প্রিয়। কিন্তু এখানে ডামরীর মত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা চরিত্র, যে চরিত্র পরতে পরতে পরিবর্তিত হয়, সেই চরিত্রের অ্যাপ্রোচটাই আমার মনে হয় ঠিক হয়নি।

পরিচালনা – পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় এই সময়ে তার একটি গোল্ডেন পিরিয়ডের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। কিছুদিন আগে রিলিজ হওয়া “কিলবিল সোসাইটি” -র “আনন্দ- মৃত্যুঞ্জয় কর ” হোক বা এই বছরের শুরুতে তার পরিচালিত ছবি ও অপর্ণা সেন- অঞ্জন দত্ত অভিনীত “এই রাত তোমার আমার” হোক, তিনি অনবদ্য কাজ করেছিলেন। হরর জঁরে পরিচালকের কাজ করার ইচ্ছাকে সাধুবাদ জানাচ্ছি কারণ আমাদের বাংলায় হরর সেনট্রিক কাজ খুবই কম হয়। কিন্তু তার শেষ দুটি হরর ওয়েব সিরিজের থেকেও (পর্নশবরীর শাপ ও নিকষ ছায়া) “ভোগ” একটি অতি দুর্বল পরিচালনা। পরিচালক এখানে জনপ্রিয় ভৌতিক গল্পগুলোকে তুলেছেন, যে গল্পগুলোর প্লট বেশ ভালো, কিন্তু সেগুলো কোনটাই পর্দায় পুরোপুরি ফুটে ওঠেনা। এটার কারণ কি বাজেট বা সঠিক ক্রু না পাওয়া নাকি স্টেজিং এর অভাব, যে কোনো কিছুই হতে পারে। আসলে হরর জঁরে কাজ করার জন্য যে ধরনের টেকনিক্যাল ক্রু, বাজেট লাগে সেটা আমাদের বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে অপ্রতুল। তাই আমাদের মত হরর প্রেমীরা কখনোই চাইবো না যে হরর জঁরের কাজ বন্ধ হোক, কিন্তু এটা অবশ্যই চাইবো যেন একটু ভালো মানের কাজ হয়। তাই পরম দা “ভোগ” দিলেও, আমরা দর্শকরা অভুক্ত রয়ে গেলাম। আশা করবো পরবর্তী হরর কাজে পরিচালক নিজের নামের প্রতি সুবিচার করবেন, মানে যে ধরনের ভালো কাজের জন্য আমরা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় কে শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি।

See Also
A Jacaranda Jamboree : Purple Reign in Kathmandu

মূল গল্প- অভীক সরকার
প্রযোজক – এসভিএফ ও হইচই স্টুডিওস
চিত্রনাট্য ও নির্দেশনা- পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়
অভিনয় – অনির্বাণ ভট্টাচার্য, পার্ণো মিত্র, শুভাশিষ মুখোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত, সুদীপা বসু।
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম – হইচই

সিরিজ রেটিং – ২/৫

What's Your Reaction?
Excited
1
Happy
1
In Love
1
Not Sure
0
Silly
0
View Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published.


Scroll To Top