চিঠিপত্র –ভাগ – ৪
Shayak is from Kolkata and like a true Calcuttan is…
শীতের দিনের আবেগটাই আলাদা, তাই চিঠিপত্রের এই পর্বে শীতের আমেজ শায়কএর কলমে।
ভাগ – ৪
চিঠিপত্র-৯
প্রিয়,
লিখবো লিখবো করে বসেই গেলাম লিখতে। কেমন আছো নতুন বছরে? তোমার চশমার পাওয়ার কি আর বাড়ল? এবার অন্তত চশমাটা ঠিক করে ইউজ করো…অবহেলায় প্রেম কমে, পাওয়ার কিন্তু বাড়ে বই কমেনা সেটা মাথায় রেখো। তা নতুন বছরে কি কি পরিবর্তন এল জীবনে? তোমার কলেজের ছাত্ররা এখনো অদিপাউস হওয়ার স্বপ্ন দেখছে? ওহ আর তোমার সেই নতুন সহকর্মী? সে কবিতা লিখছে এখনো তোমায় নিয়ে? সত্যি তোমায় নিয়ে কবিদের উত্তেজনার শেষ নেই…হা হা হা হা… নিজেকে দিয়েই এখনো সেটা ঢের বুঝতে পারি।
আমার শহরে এখন শীত আপনমনে খেলে বেড়াচ্ছে। আগেরবারের মতো এক পৌষে পালায়নি। আশেপাশে বেশিরভাগের অবস্থা ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি…এরাই আবার গরমকালে কপাল থেকে নেমে আসা ঘামের নোনতা স্বাদ জিভে মাখতে মাখতে আবহাওয়ার গুষ্টির পিণ্ডি চটকাবে আর গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে ইয়া বড় বড় লেকচার দিয়ে নিজের জিভ ছুলে নেবে। ঠাণ্ডাটা জাঁকিয়ে পড়েছে এবার জানো? মাঝে মধ্যেই রাতটা রাম আর চিলিপর্কে কেটে যাচ্ছে…। নাঃ মাতাল হচ্ছিনা…ভয় পেয়োনা। আসলে সবটাই উষ্ণতার খোঁজে। রামের নেশা কেটে গেলে তোমার দেওয়া চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছি। তাতে মনে হয় তোমার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকা যায়। তোমাকে দেখিনি বছর দুয়েক হল… এই শহরে তোমার স্মৃতিগুলো হাতড়ে বেড়াই…মনে আছে একদিন রাতে বায়না ধরলে খেজুরের রস খাবে? উফ আমারও সেকি প্রেম মাইরি ভোর হতেই বেড়িয়ে পড়লাম খেজুরের রস খুঁজতে…কোনমতে খুঁজে পেয়ে তোমার বাড়ীতে পৌঁছোতেই তুমি যে হাসিটা দিলে তাতে মনে হয়েছিল ভরা জানুয়ারিতে বসন্ত বিনা নোটিশে চলে এসেছে… পঞ্চাশ হাজার টাকার শ্যাম্পেনের বোতলেও ওই হাসিটা পেতাম না। জানো? তোমাকে দেখলেই এখনো নির্লজ্জের মতো বলতে ইচ্ছে হয় ভালোবাসি..হ্যাঁ তোমাকেই ভালোবাসি…।।
ও হ্যাঁ…নতুন বছরের দুটো ছোট্ট পরিবর্তন বলি… সিগারেট খাওয়াটা কমিয়েছি কিছুটা… আর নতুন একটা উপন্যাসে হাত দিয়েছি…তুমি ছুটিতে এলে শোনাবো। আর সোয়েটার মাফলার ছাড়া বেরিয়োনা তোমার ঠাণ্ডার ধাত… কথা শোনাটা দুতরফাই হতে হয়…।।
ইতি
প্রিয়
-সায়ক
চিঠিপত্র-১০
প্রিয়,
বহুদিন পর চিঠি দিচ্ছি। বলা ভালো কলম ধরছি। হিসেব কষলে প্রায় তিন মাস; ওইপ্রান্তে কতটা রাগ অভিমান জমা হয়েছে তার হিসেব করছিনা কারন তাহলে আর চিঠি লেখার সাহসটা থাকবেনা। তোমার দু দুটো চিঠির উত্তরে এই চিঠি… ঠিক কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না। আসলে অনেকদিন না লেখালেখি করার জন্য একটা অনভ্যাস তৈরি হয়েছে, ফলতঃ সব কথা গুছিয়ে লিখে উঠতে পারছিনা…।।
প্রথম চিঠির উত্তর না পাওয়াতে দ্বিতীয় চিঠিতে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছ। চিন্তা কোরোনা বেঁচে আছি সেটা এই চিঠি পেলেই বুঝবে। তুমি বোধহয় আমার চিঠি না পেয়ে ফোন করেছ। ফোনটা একমাস হল গত হয়েছে ঠিক সময়ে বিল জমা না দেওয়ার ফলে। ফলতঃ তোমার দুশ্চিন্তার পারদ চড়েছে স্বাভাবিক ভাবেই। চুক্তি হয়েছিল কেউ কাউকে ফোন করবনা তার জন্য চিঠিতেই উত্তর দিচ্ছি। আসলে বেশ কিছুদিন ধরেই একটা জ্বর হচ্ছিল। ডাক্তার দেখাতে টাইফয়েড বলে দিল। সে ব্যাটাচ্ছেলে সহজে ছাড়েই না। পর পর দুবার ফিরে ফিরে এলো। তা সে ওষুধ আর মনসুর আলি ও তার বৌয়ের যত্নের দৌলতেই এ যাত্রায় সুস্থ হয়ে উঠলাম। জানো তো এই প্রথম কোন মুসলমান মানুষের হাতে টানা এতদিন খেলাম। মানুষ ছাড়া আর কোনো কিছুরই বোধহয় জাত হয়না। খাবারের তো নয়ই। নইলে কি করে শবনম এর হাতের জিরে বাটা আদা বাটা দেওয়া কাতলা মাছের পাতলা ঝোলের স্বাদ তোমার সাথে হুবহু মিলে যায়? এই কদিন বেশ জ্বালিয়েছি ওদের। শবনম তোমার কথা সব বার করে নিল আমার পেট থেকে। ভাবছো কি করে তোমার কথা জানলো? আমি নাকি জ্বরের মধ্যে বহুবার নন্দিনী নন্দিনী বলে প্রলাপ বকেছি। সুস্থ হতে ও চেপে ধরল। বলে “ভাইজান আমাকে বলতেই হবে আপার ব্যাপারে।“ ভাবো কি পাগলি মেয়ে একটা… খানিকটা তোমার মতোই…সবাইকে নিমেষে আপন করে নিতে পারে… একইরকম মায়া মেয়েটার শরীরে। জ্বরের মধ্যে যখন মাথায় জলপট্টি দিত তখন তোমার ঠাণ্ডা হাতটা অনুভব করতাম…শরীরটা জুড়িয়ে যেত। তবে জানিনা তোমার মতোই পসেসিভ কিনা… কারন এই যে তোমার সাথে তুলনা করলাম শবনমের, আমি জানি এর পরের লাইন গুলো ভুরু কুঁচকে পড়া হবে…।। (দাঁড়াও হেসে নি একটু) হ্যাঁ যা বলছিলাম… যতদূর মনে পড়ে রাতের বেলা জ্বরের মধ্যে একটা স্বপ্ন প্রায়ই দেখতাম…একটা সুড়ঙ্গের আলোর প্রান্তে তুমি দাঁড়িয়ে আছো…কিন্তু আমি হেঁটে সুড়ঙ্গের ওই প্রান্তে পৌঁছতে পারছিনা…।।
যাকগে ভালো একটা কথা বলি…পরের সপ্তাহে কলকাতায় ফিরছি। জানি তুমি কলকাতায় নেই…তবু তোমার চিহ্নতো আছে শহরের আনাচে কানাচে… ওই জন্যই শহরটা বেঁধে রাখে আমায়। কলকাতা পৌঁছেই আমার নতুন নাটকের মহড়া শুরু করব। এখনো আরও একটা বছর। তুমি কলকাতা না ফেরা অব্দি আমি জ্বরের ঘোরেই থাকব। যাতে তুমি আসলে জ্বরের শেষে সূর্যধোয়া ঘরে প্রবেশ করতে পারি।
ইতি
প্রিয়
-সায়ক
What's Your Reaction?
Shayak is from Kolkata and like a true Calcuttan is deeply passionate about literature. He is a poet, a writer and a dramatist who believes in contributing to the society with his work.
