জনসমক্ষে পাঠ : ভ্যালেরি পেচেইকিনের রুশ নাটকের বঙ্গানুবাদ
পেশায় লাইব্রেরীয়ান ও নেশায় অনুবাদক স্মিতা সেনগুপ্তর কলমে উঠে এল রুশ লেখক ভ্যালেরি পেচেইকিনের অনন্য নাটক ‘জনসমক্ষে পাঠ‘। লাইব্রেরীর সংকট ও ভবিষ্যৎ নিয়ে লেখা এই সৃষ্টি পাঠককে যেমন ভাবাবে, তেমনই ফাঁকা রিডিং রুমকে পুনরায় প্রাণবন্ত করে তুলতে মঞ্চস্থ করার এক নতুন দিশা দেখাবে।
বইটি থেকে একটি নির্বাচিত অংশ নিচে দেওয়া হলো:
লাইব্রেরীতে।
মেয়েটি: পাস্তুরাইজড্ মিল্ক …
আপনারা শুধু ভাববেন না যে, আমি খারাপ বা মন্দ মেয়ে। মাপ করবেন, এই তো, আপনারা ইতিমধ্যে ভেবে ফেললেন যে, খারাপ আর মন্দ – এর মানে তো একই, কিসের জন্য মেয়েটা এটা বললো, সমার্থক শব্দের পুনরাবৃত্তি কিসের জন্য, আর সমার্থক শব্দ – একই পারট অফ স্পিচের অন্তর্গত, উচ্চারণ আর লেখায় তফাত্ মাত্র।
যাই হোক, ইয়োগার্টের ইনগ্রেডিয়েন্টস : পাস্তুরাইজড্ মিল্ক…
পাস্তুর, লুই পাস্তুর। তার সম্বন্ধে সে যে ফরাসী আর পাস্তুরাইজ করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে এ ছাড়া আমি আর কি জানি? আর পাস্তুরাইজ করার পদ্ধতি সম্পর্কেই বা আমার কি জানা আছে? কিচ্ছু না… হে ভগবান, কি করে আমি নিজের মধ্যে এমন দুধকে প্রবেশ করতে দিই যা কিনা সেই লোকটার বিধান মতো তৈরী হয় যার সম্পর্কে আমি প্রায় কিছুই জানি না?
ভ্যানিলা আর শনের ভাজা বীজের ফিলার…
ভ্যানিলা – এটা ধরে নিলাম গন্ধ বাড়াবার জন্য, শণ – উদ্ভিদ। আমি আর কি জানি শণ সম্বন্ধে? শণ থেকে শার্ট আর ইয়োগার্ট তৈরী হয়। আচ্ছা এটা কি করে হয় যে, কিছু শণ পেটে পাঠানো হয়, আবার অন্যগুলো ওটাকেই ঢেকে রাখে ওপর থেকে? কিস্যু জানি না।
পানীয় জল – জল সম্পর্কে, মনে হয়, পুরোটা বোধগম্য।
ফ্রুকটোজ, চিনি, গ্লুকোজ-ফ্রুকটোজের সিরাপ, মডিফাইড ভুট্টার মাড়, এ্যাসিডিটি রেগুলেটার, লেমন এ্যাসিড, প্রায় ন্যাচারাল ভ্যানিলা টেস্টের এরোমাটাইজার…
এখান থেকে আর কিছুই মাথায় ঢুকছে না। টেস্ট এরোমাটাইজার – এটা কি? প্রায় ন্যাচারাল – ন্যাচারাল নয় কেন? অলিগোফ্রুকটোজ – এই শব্দটা আমাকে ভয় দেখাচ্ছে। ভয় দেখায় সব কিছুই যা আমি বুঝতে পারি না।
রঞ্জক পদার্থ : বিটা ক্যারোটিন, চিনি, মডিফাইড ভূট্টার মাড়, পেকটিন, ইয়োগার্টের টক দুধের মাইক্রোঅর্গানিজমগুলোকে ছাঁচ হিসাবে ব্যবহার করে তৈরী করা এডিবল জিলেটিন…
জীবানু! জীবানু, যেগুলো এখানে নাকি কিসের যেন টেন টু দি পাওয়ার সেভেনের কম নয়! হে ভগবান, আর এই অবোধ্য শব্দবহর এবার আমার ভেতরে ঢুকে পড়বে। এই ইয়োগোর্ট আমি কয়েকশ বার খেয়ে, এই সমস্ত পদার্থকে নিজের শরীরের ভেতরে ঢুকতে দিয়ে নিজের হৃদয়ের পাশে ডেঁরা বাঁধতে দিয়েছি। আমাদের ভেতরে তো আত্মা আছে, তাই না? আর এই সমস্ত শব্দ এখন আমার ভেতরে গিয়ে এলিয়ে পরবে আর তারপর খুব শিগগিরি আমাতে পরিনত হবে। কি করে আমি নিজের ভেতরে এই অবোধ্য জিনিষগুলোকে ঢুকতে দিই? কই নিজের বাড়ীতে তো আমি অচেনা কাউকে ঢুকতে দিই না, বা তার চেয়েও বড় কথা, তাদের নিজের কাছে এনে তুলি না, তাদের সামনে নিজের পেট খুলে ধরি না। হে ভগবান, আমায় পথ দেখাও!
এই তো আপনারা এখন আমার দিকে তাকিয়ে আছেন আর ভাবছেন : মেয়েটা ভয়ঙ্করী, রাক্ষুসী; যদি মেয়েটা কারো বউ হয়, তাহলে খারাপ বউ, যদি মা তো খারাপ মা । দেখুন, কি সহজে মেয়েটা নিজের ভেতরে অলিগোফ্রুকটোজকে ঢুকতে দেয়, হ্যাঁ, কি আর বলি, ওর ভেতরে টেন টু দি পাওয়ার সেভেন সংখ্যক জীবানুর থাকার জন্যও জায়গা জোটে! এদিকে মেয়েটা এমনকি বোঝে পর্যন্ত না যে, কিসের বা কার সাথে ওঠাবসা করছে!
হ্যাঁ, আমি এইরকমই, আমি আপনাদের কাছেপিঠেই থাকি। আমি শুধু এখন বুঝলাম যে, আমার চারপাশের জগত্ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।
শুরু হয়েছিল সব যথেষ্ট সাধারণভাবেই, আজ সকালেই তো…কেন জানি ঘড়ির এ্যালার্মটা কাজ করলো না আর আমি ঘুম থেকে উঠলাম অন্যদিনের চেয়ে দেরীতে, বেশ অনেকটা দেরীতে। ইনস্টিটিউট যেতে লেট হয়ে গেল। রাশিয়ান ল্যাংগুয়েজের দুটো, ওয়ার্লড লিটেরেচরের একটা আর একটা ফিজিক্যাল ট্রেনিং-এর ক্লাস ছিল। আমি, অবশ্যই, খুব হতাশ হয়ে পরলাম, কিন্তু আরো বেশী মুষড়ে পরলাম এই কারনে যে, এত বেশী সময় ধরে ঘুমোলাম। পছন্দ করি না এরকম অনুভূতি – যেন নিজেই নিজের পকেট কেটেছি। আমি তক্ষুনি রান্নাঘরে গেলাম আর ঢুকেই সিগারেট ধরালাম। ছাইদানিতে ashtray লেখা স্টিকার মারা। ছাইদানি ইংরিজিতে ashtray। ইটালিয়ান ভাষায় বলে Posacenere (পসাসেনেরে)। আমার বন্ধু ইটালিয়ান ভাষাটা ভালই জানে, এমনকি সাইকেলে করে পুরো ইটালি ঘুরে বেড়িয়েছে, কিন্তু এই শব্দটা কিছুতেই মনে রাখতে পারেনি। এমনকি বার ছয়েক ব্যবহার ও মনে করিয়ে দেওয়ার পরও শব্দটা কিছুতেই ওর মগজে শক্ত হয়ে বসলো না। আর তাই আমি ভাবলাম ওর কথা, ছাইদানি, ছাই, ভস্ম… মা নেই বাড়ীতে কাজেই আমি সিগারেট খেতে পারি…কিন্তু কতখানি ফালতু সময় আমি ঘুমিয়ে নষ্ট করলাম। আর তাও যদি স্বপ্নটা ইন্টারেস্টিং হতো, কিন্তু ওটা আমি মনেও করতে পারছি না।
আমি এত হতাশ হয়ে পড়লাম যে হতাশা কাটাতে কিছু খেতে ইচ্ছে করলো। আর তাই ফ্রিজ খুললাম আর আবিষ্কার করলাম যে ফ্রিজে কিচ্ছু নেই। এমনকি ডীপ ফ্রিজটাও শুকনো আর ঠান্ডা, মরা মানুষের ঠ্যাংয়ের মত। আমি সোয়েটার গায়ে চাপালাম, স্যান্ডাল পায়ে গলালাম আর খুব তাড়াতাড়ি নীচের ২৪ ঘন্টা খোলা দোকানটায় এলাম। ভেতরে কয়েকজন আঠালো বুড়ি ঘুরছিল, যাদের সাথে আমার প্রতিটা বাঁকে ঠোক্কর লাগছিল।
টাকা আমার খুব কমই ছিল, এত কম যে, ইয়োগার্ট আর এক প্যাকেট সিগারেট ছাড়া কিছুই নিতে পারলাম না। আর এই জার্মান দার্শনিক শব্দের মতো লম্বা লাইন ক্যাশ কাউন্টারে। এখানে কিছুই করার নেই। আমি দাঁড়িয়ে আছি আর হাতের তালুতে ইয়োগার্টের কৌটোটা ডলছি, যেটা কিনা দুধের ভস্মসমেত কফিন। আর এই কিছু করার নেই বলেই আমি ইনগ্রেডিয়েন্টসের তালিকাটা পড়তে শুরু করেছিলাম…
পাস্তুরাইজড্ মিল্ক…
পুরোটা পড়ে উঠতে পারলাম না, ক্যাশিয়ার আমাকে হাঁক দিল, আমি শব্দটা থেকে চোখ না তুলেই টাকা এগিয়ে দিই তাকে, ক্যাশ মেশিনটা ঝনঝনিয়ে ওঠে, একটা হাত প্লেটের ওপর কিছু খুচরো ফেলে দেয়, যেগুলো আমি না দেখেই নিয়ে নিই, জেগে উঠি, আড় চোখে দরজা খুঁজি আর রাস্তায় বেড়িয়ে পরি। আমাকে এই লেখাটা, এই শব্দ, শব্দগুলো, যেগুলো আমি বুঝতে পারছি না, শান্তি দিচ্ছে না । এগুলো কি বোঝাতে চাইছে?
আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে এগুলো নিয়ে ভাবছিলাম আর শব্দগুলোর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বার বার পড়ে দেখছিলাম। নিজের জীবন বাঁচাতে আমার হাতে আর কত মিনিট আছে? আমার জীবন বিপন্ন, যদিও আমার শরীর ট্রয়ের চেয়েও বেশী সুরক্ষিত ছিল। আর ট্রয়ের ঘোড়া দেখা গেল – এই ইয়োগার্ট। এখন আমি দাঁড়িয়ে আছি আর ভাবছি, কি করে তাড়াতাড়ি জানা সম্ভব আমার কি হবে : বাড়ীর কম্প্যুটারের দিকে দৌড়বো নাকি… এই তো পুরনো ও পরিচিত সেই শিশু ও কিশোরদের জন্য লাইব্রেরীটা। নাকি দৌড়বো কম্প্যুটারের দিকে, নাকি লাইব্রেরী, না কম্প্যুটার -… না, না, ওটার দিকে আমি আর ঘেঁষবো না! ওই যন্ত্রটাই কি আমার খাবারের ধরন গড়ে তোলেনি? ওটার পর্দাতেই কি ভেসে ওঠেনি জানলাগুলো, যেগুলো একটা ছবির দিকে এগোচ্ছিল, যেটায় সুখী মেয়েরা মুখ হাঁ করছিল, তারপর হাঁগুলো বড় হচ্ছিলো আর সেটায় ইয়োগার্ট সমেত ঢুকছিল একটা কম্পিত চামচ? তারপর সেটা পেটে পড়লো আর সেখানে মিশে গেল কতগুলো উত্তাল ঢেউয়ের সাথে, যেগুলো ইয়োগার্টের স্পর্শে শান্ত হয়ে গেল, পেটে কাব্যিক পরিবেশ তৈরী হল, এমনকি পেটস্থ ঢেউয়ের ওপর চাঁদের আলোয় নৌকা ভাসতে দেখা গেল। কিন্তু পেটে কোথা থেকে চাঁদ আর নৌকা এল? এটা কোন মাপের পেট? নাকি যারা এই বিজ্ঞাপনটা বানিয়েছে তারা খোঁজ নিয়ে জেনেছে যে, আমাদের পৃথিবী লেভিয়াথানের পেটের মধ্যে রয়েছে!
না, আমি আর এই দৈত্যটাকে বিশ্বাস করবো না, এই আলোকিত বোর্ডটাকে, এই ট্যাবুলা রাসাকে। শুধু ট্যাবুলা রাসা-তে সবসময় দেখা যেত – কে মুছল, কে লিখলো, আর এখানে কে মোছে বা লেখে?- কে?
বইটি কিনতে ভিজিট করুন https://www.bhashasamsad.com/ অথবা ২০২৬ কলকাতা বইমেলায় ভাষা সংসদ-এর স্টলে (Stall 642) চলে আসুন।
