Now Reading
গ্যালাক্টোগগ- ‘এক অজানা উড়ন্ত বস্তু’

গ্যালাক্টোগগ- ‘এক অজানা উড়ন্ত বস্তু’

Avatar photo
গ্যালাক্টোগগ

এই প্রবন্ধে স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য মাতৃদুগ্ধের গুরুত্ব, পুষ্টির চাহিদা, এবং ‘গ্যালাক্টোগগ’ বা দুধ বৃদ্ধিকারী উপাদানের ভূমিকা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শিশুর স্বাস্থ্য, মায়ের পুষ্টি এবং মাতৃদুগ্ধ উৎপাদনে সহায়ক প্রাকৃতিক ও খাদ্য উপাদানগুলোর বিষয়ে পাঠকদের সহজ ভাষায় ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

কথা বলা শুরু করার আগে, যারা বা যে কয়েকজন এই বিষয়ে আমার কথা শুনতে আগ্রহী, তাদের জ্ঞাতার্থে, এই বিষয়ে আমার কথা বলার প্রয়োজন বা প্রাসঙ্গিকতা আগে বলে নেওয়া দরকার। আমাদের এই ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ নিয়ে গড়ে ওঠা দেশে “নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান” এর বৈচিত্র্যের মাঝেও যে বৈচিত্র্য টি কোথাও গিয়ে উঁকি দেয়, তা হলো- খাদ্যের বৈচিত্র্য। এই খাদ্যের বৈচিত্র্য কে সাথে নিয়েই যখন আমাদের যাপন; শরীর, মন-সবকিছুকেই ভালো রাখার চেষ্টা এবং আমরা যারা পুষ্টি নিয়ে কাজ করি, পড়াশোনা করি; তারা যখন একটা কথা সবসময়েই আওড়াই- জীবনের প্রত্যেকটা ধাপে খাদ্য এবং পুষ্টির একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে; তখন জীবনের একটি বিশেষ ধাপে এই ‘গ্যালাক্টোগগ’ (যা নিয়ে আলোচনা) এর কাজ, অবদান অনস্বীকার্য তো বটেই।
এই বিষয় নিয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে গিয়ে এই শব্দবন্ধের সাথে আমার পরিচয় হয়। জানিনা, সাধারণ জনগণ ( খুব নগণ্য শতাংশ আধুনিক মানুষ নিজেদের এই তালিকা থেকে ব্রাত্য রাখতে পারেন) এই শব্দবন্ধের সাথে কতোটা পরিচিত বা আদৌ পরিচিত কিনা। তাই সেই বিষয়ে খুব সাধারণ, প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার জন্য আমার এই অল্প কিছু বলে যাওয়ার চেষ্টা।

আর বেশি ভনিতা না করে যে বিষয়ে কথা, সরাসরি
তাতে চলে যাওয়াই ভালো। একটি মেয়ে শৈশব থেকে কিশোরী, বয়স বাড়তে বাড়তে যুবতী হওয়ার সাথে সাথে ‘Biological’, ‘Emotional’ এবং খানিকটা ‘ Social’ influence (শব্দটি ভেবে চিন্তে ব্যবহৃত) এ গর্ভবতী হয়। নানা রকম শারীরবৃত্তীয়, মানসিক, হরমোন জনিত পরিবর্তন, পুষ্টি উপাদানের চাহিদার হেরফেরকে সাথে নিয়ে সেই ধাপ কাটাতে না কাটাতেই সে পরিচয় পায় ‘স্তন্যদাত্রী জননী’র এবং কথা অনুযায়ী কাজের হিসেবে জীবনের প্রতিটি ধাপে, প্রতিটি ক্ষেত্রে যেভাবে পুষ্টি উপাদানের চাহিদার বদল হয় এবং তার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবও থাকে শরীর গঠনে, সুস্থ থাকায়, জীবনের এই ক্ষেত্রও তার ব্যতিক্রম কিছু নয়।

শক্তি (এনার্জি) থেকে শুরু করে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট সহ সব ধরনের ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট হোক কিংবা ভিটামিন, মিনারেলের মতো মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট- যেকোনো কিছুরই প্রয়োজনীতা, চাহিদা বাড়ে স্তন্যদাত্রী মায়ের খাদ্যে। কারণ মোটামুটি আমরা সবাই এ’কথা জেনে অভ্যস্থ – ৬ মাস অবধি মূলত শিশুর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের একমাত্র সম্বল ই হলো মাতৃদুগ্ধ, মায়ের কোল এবং মা। সুতরাং মায়ের খাদ্য থেকেই তার নিজের পুষ্টি সহ তার সন্তানের পুষ্টি হবে। এই সোজা হিসেব একদম জলের মতো। ধীরে ধীরে এই ৬ মাসের পর থেকেই ‘প্যানক্রিয়াটিক অ্যামাইলেজ’ নামক উৎসেচক (Enzyme) তৈরী হতে শুরু করে, পাচনশক্তি (Digestive activity) বাড়তে থাকে এবং অল্প অল্প করে মাতৃদুগ্ধ’র সাথে সাথে তার জীবনে আগমন হয় ‘তোলা খাবার'(Weaned Food) এর।
তাহলে মোটামুটি ভাবে এটুকু বোঝা গেলো, ৬ মাস অবধি শিশুর বৃদ্ধি-বিকাশ (Growth-Development), পুরোটাই প্রায় নির্ভর করছে মায়ের ওপর, ‘মাতৃদুগ্ধ’র ওপর। এখন মাতৃদুগ্ধ’র প্রয়োজনীয়তা- সে শিশুর জন্য হোক বা স্বয়ং মায়ের শরীরের জন্য, তা এখানে আলোচ্য বিষয় নয়। তবুও যে কয়েকটি কথা একদম না বললে হয়তো মাতৃদুগ্ধ’র গুরুত্ব পাঠকদের অনুধাবন করাতে আমি বা আমার বলা কথাগুলো অপারগ হবে, যেমন মাতৃদুগ্ধের বিভিন্ন রকম পুষ্টি উপাদান ব্যতিরেকেও বেশ কিছু হরমোন, ইমিউনোগ্লোবিউলিন, লিম্ফোসাইট, ম্যাক্রোফেজ (শিশুকে অনাক্রম্যতা দেয়), উৎসেচক (Enzyme) রয়েছে; যা শিশুকে একদম ‘ফার্স্ট লাইন ডিফেন্স’ প্রদান করে। আর সদ্য মাতৃত্ব লাভের পর বাড়তি ওজন হ্রাস, জমে থাকা ফ্যাট গুলো নিষ্কাশন করে দেওয়া, ডায়াবেটিক মায়েদের কৃত্রিম ইনসুলিনের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করে।

সুতরাং বিভিন্ন ধরনের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতিতে থাকা মায়েদের চেষ্টা করতে হবে শিশুদের স্তন্যপান (Exclusive Breast feeding) করানোর জন্য।

এতো কথার পর এটুকু অন্তত সকলের কাছেই পরিষ্কার যে শিশুর সম্পূর্ণ পুষ্টি, সন্তুষ্টি শুধুই এখন নির্ভরশীল- মাতৃদুগ্ধ’র ওপর; সে মা পরিপূর্ণ পুষ্টির অধিকারী হোক কিংবা অপুষ্টির; মাতৃদুগ্ধ’র পরিমাণে তফাৎ ঘটবে, এবং যার ফলভোগ করতে হবে শিশুকেই। বরং যেটা হবে, তা হলো মাতৃদুগ্ধ’র পরিমাণে তফাৎ ঘটবে, এবং যার ফলভোগ করতে হবে শিশুকেই। যদি একঝলকে-

• জিনগত প্রভাব (Genetic Heritage)
* কায়িক পরিশ্রম (Physical activity)
* অসুস্থতা
* অপর্যাপ্ত পানীয় (Inadequate fluid)
•অপুষ্টি
•মানসিক চাপ (Stress, Anxiety)
* Engorged breast, Sore nipples- এই জাতীয় সমস্যাকে একটা Broad aspect এ দেখা যায়, তাহলে এরাই অনেকাংশে দায়ী মাতৃদুগ্ধ’র পরিমাণের হেরফের ঘটাতে।

এবার কিছু ক্ষেত্রে, যেমন ধরা যাক, মায়ের অনুপস্থিতি ( মৃত্যু, গুরুত্বপূর্ণ কর্মজীবন), গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা- ইত্যাদি প্রভৃতি’র জন্য ‘Artificial Feeding’, ‘Expressed Milk’, ‘Human Milk Bank’ এর ব্যবস্থা তো আছেই। সেটা অনেক পরের অপশন এবং সেটা ব্যতিক্রম। অথবা যেসব মায়েরা এটা ভেবে চিন্তিত থাকেন, শিশুর পর্যাপ্ত পুষ্টি তিনি মেটাতে পারছেন না; তাই সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞাপনের দামি গুঁড়ো দুধ তার শিশুকে দিতেই হবে, তাহলেই শিশুর পরিপূর্ণ পুষ্টি, বৃদ্ধি, বিকাশ হবে; তাদের জন্য আরো বেশি বাড়তি উদ্যোগে বলা- শিশুর কাছে মাতৃদুগ্ধ’র প্রয়োজনীয়তা বা মায়ের সাথে একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরীর ক্ষেত্রে মাতৃদুগ্ধ যে কতখানি; তার সত্যিই কোনো পরিপূরক হয়না। হতে পারেনা। নিঃসন্দেহে এ’কথা বলা যায়- “Mother’s milk is must”। এখনও যদি দেখা যায়, মা সবরকম প্রচেষ্টা করে, সঠিকভাবে, সঠিক নিয়মে শিশুকে খাওয়াচ্ছেন; তবুও শিশুর পুষ্টি সম্পূর্ণ হচ্ছে না, শিশু কাঁদছে, ঘ্যানঘ্যানে ভাব থাকছে; একটা বিষয় এবার ভাবনার মধ্যে আনুন- পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ সে পাচ্ছে তো!
যেকোনো রকম ভাবে, যে কোনো দিক থেকেই উত্তর যদি আসে- “না, সঠিক পরিমাণ দুধ শিশু পাচ্ছে না;
ঠিক তখনই – “ফাইভ প্রবলেমস, ওয়ান সলিউশন” এর মতো এখানেই হাজিরা দেয় পুষ্টিবিজ্ঞানের ভাষায় ‘Galactogogue’ এবং চলতি ভাষায় ‘Milk Booster’ বা আরেকটু কঠিন করে বললে ‘Lactose Inducer’। এর কাজই হচ্ছে, ‘প্রোল্যাকটিন’ নামক দুগ্ধ উৎপাদনকারী হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া। ‘ডোপামিন’, আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটার, যে কিনা এই ‘প্রোল্যাকটিন’এর পরিমাণ কমিয়ে দেয়; এবং ‘গ্যালাক্টোগগ’ সেই ‘ডোপামিন অ্যান্টাগনিস্ট’ (কাজে বাধা দেয়) , যে ডোপামিন কে কমিয়ে রেখে ‘প্রোল্যাকটিন’ কে বাড়িয়ে দেয় এবং সঠিক পরিমাণে মাতৃদুগ্ধ উৎপাদন করতে সহায়তা করে।

এবার নিশ্চয়ই ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। মনে মনে সবাই হয়তো বলছেন- “ধুর, এতো জটিল কথা রাখুন তো। কি বা কি কি খেলে বা কি পদ্ধতিতে এই ‘গ্যালাক্টোগগ’ এর নাগাল পাওয়া যাবে; সেগুলো বাতলে দিন দেখি।” বা হয়তো অনেকেই মনে মনে ভাবছেন, ” ‘গ্যালাক্টোগগ’ বেশ দামি জিনিস। কঠিন একটা নাম। বাজারে একদমই সস্তা ও সুলভ নয়।”

আরে মশাই, দাঁড়ান দাঁড়ান। আর দু একটা কথা বলি।

স্তন্যদাত্রী মায়ের খাদ্যে অবশ্যই ওটস, দুধ, বাদাম, কাজু, মাছ, মাংস, সাবু, সবুজ শাকসবজি, মিলেট (জোয়ার,বাজরা, রাগি) র মতো খাদ্য এবং মেথি, মৌরির মতো মশলা রাখছেন তো! বেশ বেশ একদম দারুণ ভাবে ‘গ্যালাক্টোগগ’ এর কাজ হবে।

See Also
Always-Available

আর কানে কানে বলে দিই- ‘Crying’ এবং
‘ Breast Sucking’ এর মতো শিশুর এই দুটো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবর্ত ক্রিয়াও দারুণ এক একটা ‘Natural Galactogogue’। আর যদি শিশুকে নিয়ে বাড়তি চিন্তিত হয়ে পড়া অভিভাবক বিশেষত মা, ছয় মাসের আগে থেকেই শিশুকে ‘তোলা খাবার’ (Weaned Food) দিতে শুরু করেন, শিশুর এই ‘Sucking’ রিফ্লেক্স বা প্রতিবর্ত ক্রিয়াতে ব্যাঘাত ঘটে। তাই ভুলেও ও কাজটি নয়।

অতএব, আমার এতো কথা বলতে চাওয়ার সর্বোচ্চ মূল কথা- মায়ের সাথে শিশু্র আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠুক। সেই বন্ধন দৃঢ় হোক। শিশুর পুষ্টি, বৃদ্ধি, বিকাশ এবং মাতৃত্বের পরেও মা সুন্দর, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হন শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান করানোর মাধ্যমে।

কোম্পানির লাভের বিজ্ঞাপন এড়িয়ে, সঠিকভাবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ‘রাষ্ট্রের আগামী সম্পদ’দের দায়িত্ব নিন।
শেষে কবি কৌশিক ব্যানার্জীর ‘মাঝে মাঝে’ কবিতার লাইন উচ্চারণ করি! শক্ত করি মনকে!
” দু মাস আগে ছেলের মুখ দেখেছে, খবর দিয়ে বললো- এ বিশ্ব কে তো এ শিশুর বাসযোগ্য করতে পারলাম না, এখন এ শিশুকে এ বিশ্বের বাসযোগ্য করে যেতে হবে।”
এই পচাগলা সমাজের প্রতিদিনের সকালে চায়ের চুমুক এবং দৈনিক পত্রিকায় মাঝেমধ্যে উঠে আসা- “অপুষ্টি ভারতের শিশুর মৃত্যুর কারণ। পাঁচ বছরের নীচে ৬৯ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে অপুষ্টিতে। ইউনিসেফের রিপোর্টে উঠে এসেছে এমনই তথ্য। প্রতি সেকেন্ডে ৫ বছর বয়সের নীচের শিশুরা অপুষ্টির শিকার হচ্ছে।” এই লাইনগুলো আমাদের ভাবাক। সারাদিন টা জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে দিক। সমাজটাকে পাল্টে দেওয়ার রাগে হাতটা একবার মুঠো করতে শেখাক। আর ভরসার অনুঘটক হোক ঐ কবিতার লাইনগুলি।

তাহলে! এবার নটেগাছ টা মুড়োনো যাক!

At East India Story, we’re not just about what bleeds or leads. We’re about what inspires, surprises, and reminds us all that across mountains, cultures, —there’s more that connects us than divides us.

What's Your Reaction?
Excited
3
Happy
0
In Love
0
Not Sure
0
Silly
0
View Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published.


Scroll To Top