Now Reading
“বাটানগর ড্রিম ড্যান্স একাডেমি” – অনুপ্রেরণা ও শিল্পের ২১ বছর!

“বাটানগর ড্রিম ড্যান্স একাডেমি” – অনুপ্রেরণা ও শিল্পের ২১ বছর!

Avatar photo
বাটানগর ড্রিম ড্যান্স একাডেমি - নৃত্যনাট্য 'সম্রাট অশোক, দ্য আনটোল্ড স্টোরি'

বাটানগর ড্রিম ড্যান্স একাডেমি ১৭ই মে ২০২৫-এ তাদের বার্ষিকী ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ উদযাপন করলো। নৃত্যনাট্য ‘সম্রাট অশোক’ মুগ্ধ করলো দর্শকদের। কলমে: রাজ কুমার মুখার্জী

কলকাতার আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায় সাহিত্য-সংস্কৃতি। ভারতের কালচারাল রাজধানী কলকাতা – নাচ, গান, ছবি আঁকা, সিনেমা, কবিতা, নাটকের পীঠস্থান।

গত ১৭ই মে ২০২৫ পীঠস্থানের এক মন্দিরের ২১ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের সাক্ষী ছিলাম – ‘বাটানগর ড্রিম ড্যান্স একাডেমি’। অনুষ্ঠানের নাম ছিল শ্রদ্ধাঞ্জলি। সবার আগে নিজেকে শ্রদ্ধা করতে শেখা সবচেয়ে জরুরি। নিজেকে শ্রদ্ধা করতে না জানলে অপর কে শ্রদ্ধা করা যায় না। এ নামকরণের মাহাত্ম্য এখানে। বাটানগর স্পোর্টস ক্লাবের অডিটোরিয়াম ভর্তি হয়েও বেশ কিছু দর্শক প্রেক্ষাগৃহের শেষে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কারণ বোঝা গেল মূল পর্বের অনুষ্ঠানের পর।

বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠান, স্বাভাবিকভাবেই পুরস্কার বিতরণ, সন্মাননা জ্ঞাপন ইত্যাদি প্রভৃতি থাকবেই। সেই পর্বটি বাদ দিলে সমগ্র অনুষ্ঠানটি দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটিতে দলবদ্ধ নাচ এবং মূল পর্বে নৃত্যনাট্য ‘সম্রাট অশোক, দ্য আনটোল্ড স্টোরি’।

প্রেপ গ্রুপ (বয়স তিন থেকে সাত)
প্রেপ গ্রুপ (বয়স তিন থেকে সাত)

প্রথম পর্বের কথা বলতে গেলে সবার আগে খুদে দের নাচের কথা বলতে হয়। খুদে শিল্পীদের বয়স তিন থেকে বড়জোড় সাত। তারা সাজগোজ করেই খুশি। খুশি তে ঝলমলে একঝাঁক প্রজাপতি, নাইবা থাকলো সবার একসঙ্গে নাচের এক মুদ্রা থেকে অন্য মুদ্রায় চলে যাওয়া; ফুলের মতন শিশুদের দেখতেই সুন্দর। প্রজাপতির পাখনা মেলে উড়ার যেমন ছন্দ না থেকেও সুন্দর, এদের নাচ সেই রকম সুন্দর।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ধ্রুপদী নৃত্যের ঘরানায় ‘সরস্বতী বন্দনা’ ও ‘গনেশ ব্ন্দনা‘ নাচ দুটি মনে রাখার মতন। এছাড়াও লোকনৃত্যটি চমৎকার। লোকনৃত্য দেখতে দেখতে রাঢ় বাংলার সাঁওতাল নাচের কথা মনে পড়ে যায়।

গণেশ বন্দনা
গণেশ বন্দনা

মহিলাদের সারাদিন ঘরের কাজ করার ফাঁকে নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন, সে কথা মনে রেখে ফিট ড্রিম টিমের উপস্থাপন, যোগ ব্যায়ামের আধারে নাচ ‘সর্ব্বে ভবতু, সুখেন ভবতু’। সুখে থাকতে গেলে স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নিতে হয়।

রবীন্দ্রসংগীত ‘মোর বীণা উঠে কোন সুরে বাজে’ সহযোগে নাচটি, রবীন্দ্র নৃত্যের মাঝে মাঝে ব্যালের ছোঁয়া -কোরিওগ্রাফাররের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়।

এতদিন কোরিওগ্রাফি বলতে দেখেছি মানব পিরামিডের মাথা থেকে লাফ, শূন্যে ডিগবাজি, কাউকে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে লুফে নেওয়া — যেন সার্কাসে ট্রাপিজের খেলা। এখানে সার্কাস মার্কা নাচ দেখলাম না। নাচ একটা শিল্প, মাদারির খেল নয়; নাচ কে সন্মান জানানো বাটানগর ড্রিম ড্যান্স একাডেমীর বৈশিষ্ট্য।

সম্রাট অশোক ও তিষ্যরক্ষার বিবাহ
সম্রাট অশোক ও তিষ্যরক্ষার বিবাহ

এবার বলি মূল পর্বের কথা। নৃত্যনাট্য ‘সম্রাট অশোক, দ্য আনটোল্ড স্টোরি’। সম্রাট অশোকের না জানা কথা, নাচের মাধ্যমে গল্প বলা। অনেক চরিত্রের অবতারণা করা সত্ত্বেও, কোথাও এতটুকু বেসামাল হতে দেখলাম না। প্রতিটি অঙ্কের দলবদ্ধ নাচ পুরো উপস্থাপনাকে মালার মতন এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে। যেখানে যে রকম প্রপ্ দরকার, কোন কার্পণ্য নেই। গুরুগৃহে উৎসব প্রাঙ্গণ অথবা মধ্য যামে কুপির ব্যবহারে নাচের উপস্থাপনা কে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। ‘আলবেলা সজন আও রে’ গানটির সঙ্গে নাচ, মনে দাগ কেটে যায়। যৌবনের অশোক চরিত্রে সৈকত দাস এবং মহীয়সী তিষ্যরক্ষার চরিত্রে বনানী মুখার্জী নজর কাড়ার মতন। মহারাণী তিষ্যরক্ষার চিতায় রাজকুমার কুণালের অগ্নি সংযোগের মধ্য দিয়ে শেষ হয় নৃত্যনাট্য।

মহারাণী তিষ্যরক্ষার মৃত্যুর পর রাজকুমার কুণাল বিদায় জানাতে এসেছেন ।
মহারাণী তিষ্যরক্ষার মৃত্যুর পর রাজকুমার কুণাল বিদায় জানাতে এসেছেন ।

প্রতিটি নাচের মাঝে ভাষ্য পাঠের মাধ্যমে পরবর্তী ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে। যিনি ভাষ্য পাঠ করেছেন, তাঁর ভরাট কন্ঠস্বর শ্রুতিমধুর।

See Also
IFFLA Returns With An Expanded Industry Days Programme

আলোকসম্পাতের দায়িত্বে ছিলেন শ্রী দীনেশ পোদ্দার। কম কথার মানুষ, আলোকসম্পাত তাঁর হয়ে কথা বলে। স্পট আলোর ব্যবহার মঞ্চকে আকর্ষণীয় করে তোলে। দু-একটি আলোর কথা না বললে অন্যায় হবে। প্রথমটি সম্রাট অশোকের রাজ্যাভিষেকের সময় মহামন্ত্রী রাধাগুপ্ত অশোক কে রাজমুকুট পরিয়ে দিচ্ছেন অথবা কলিঙ্গ যুদ্ধের পর দয়া নদীর জল সাদা থেকে রক্ত বর্ণ এবং শেষ দৃশ্যে রাজকুমার কুণালের চিতায় অগ্নি সংযোগ। দীনেশ পোদ্দারের যথোপযুক্ত আলো না থাকলে নৃত্যনাট্য ‘অশোক’ উজ্জ্বল হত কিনা সন্দেহ ! এইখানেই দীনেশ পোদ্দার মহাশয়ের মুন্সীয়ানা কে কুর্নিশ করতে হয়।

সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন শ্রীমতী ডোনা জানা। সঞ্চালিকা অনাবশ্যক কিছু বাক্য ব্যয় করে সময় দীর্ঘায়িত না করলে ভালো হত।

পুষ্পক মুখার্জী, কর্ণধার, বাটানগর ড্রিম ড্যান্স একাডেমী
পুষ্পক মুখার্জী, কর্ণধার, বাটানগর ড্রিম ড্যান্স একাডেমী

সবশেষে যার কথা না বললে অনুষ্ঠানের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় না, তিনি হলেন বাটানগর ড্রিম ড্যান্স একাডেমীর রূপকার ও কর্ণধার শ্রী পুষ্পক মুখার্জী। সন্ধ্যার অনুষ্ঠানটি পরিকল্পনা ও পরিচালনা পুষ্পকের। একুশ বছর আগে চারজন বাচ্ছা কে নিয়ে শুরু করেছিলেন পথচলা। সেই ছোট চারাগাছ আজ বৃক্ষে পরিণত। ধৈর্য্য এবং অধ্যবসায় থাকলে কোথায় যাওয়া যায়, তার উদাহরণ পুষ্পক নিজে।

আজ ‘সম্রাট অশোক, দ্য আনটোল্ড স্টোরি’র প্রথম স্টেজ শো, আশা ও ভরসা রাখি এই শো একদিন দেশে ও বিদেশের একাধিক শহরে নিজের বিজয় কেতন ওড়াবে।

What's Your Reaction?
Excited
6
Happy
6
In Love
3
Not Sure
0
Silly
0
View Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published.


Scroll To Top