Now Reading
বাঁশ চুরির গল্প

বাঁশ চুরির গল্প

Avatar photo
হেঁকু এবং বাঁশ

ক্লাবের স্মারক পত্রিকা বেরুনোর পরে আটের পাতায়, কৃতজ্ঞতা স্বীকারের পাতায়, জ্বল জ্বল করে হেঁকুর নাম – পাশে লেখা “আমাদের বাঁশ দিয়ে সাহায্য করবার জন্য”। কি করে ঘটলো এই কাণ্ড ? পড়ে দেখুন হেঁকুর নতুন গল্প ।

“হেঁকু  সিরিজ” 

এই পাণ্ডব বর্জিত শহরতলী তখন নিয়নের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠেনি । পাড়ার রাস্তায় হেলে পড়া ল্যাম্প পোস্টের সহায় তখনও হলদেটে ফিলামেন্টের বিচ্ছুরণ । বড় রাস্তাটা গড়িয়াহাটের দিক থেকে এসে যাদবপুর পেরিয়ে চলে গ্যাছে গড়িয়ার দিকে । গরমে পিচ গলে তার গায়ে দাগরাজি করে মোটর গাড়ির চাকা ; বর্ষায় পাশের কাঁচা ড্রেন উপচে জল থই থই । সেই রাস্তা থেকে খানিক হেঁটে এক পাড়া । পানাপুকুর ঘেঁষে জোড়া হেলা খেজুর গাছের পাশের মেঠো রাস্তায় হেঁকুদের দুতলা বাড়ি ।

পাড়ায় একটা ক্লাব ছিল পাঁচিল ডিঙোনো দূরত্বে । মিলন মেলা বা ঐ ধরণের এক সাবেকি নাম । রঙচটা এক তলা ঘরে কিছু ভাঙা টেবিল চেয়ার আর আস্ত একটা ক্যারম বোর্ড । বোর্ডের ওপর একটা তারে বাঁধা ঝুলন্ত আলো , ঝুলে ভরা । একটা কাঠের আলমারি । তারও ভারী দৈন্যদশা । মেঝেতে একটা একদা রঙিন শতরঞ্চি জবুথবু হয়ে পড়ে থাকে । সেটাকে হাতে করে তোলা মানে নাক , চোখ , মুখের দফারফা । এ ঘরের এক কোণায় সবচেয়ে যে বা যিনি যত্নে থাকেন তিনি হলেন পাঁচ ফুটি লম্বা , হংস চারিণী মা সরস্বতী ! কাগজ ফুলের মালার রঙ চটে গেলেও ঠোঁট আর হাতের দশ আঙ্গুলের নখ তাঁর দিব্যি রঞ্জিত । মূর্তির অধিষ্ঠান মার্বেল পেপার এ মোড়া একটা কাঠের প্ল্যাটফর্মের উপরে। ক্লাবের সরস্বতী পুজো বরাবরই এখানেই হয়ে আসছে । বছর বছর শুধু মূর্তি , সাজসজ্জা , এই সব বদল হয় । কিন্তু মা সরস্বতী কে নিয়ে টানা হেঁচড়া করবার পক্ষে ক্লাবের সভ্য অসভ্য কেউ ছিল না ।

কিন্তু সেবার বসন্ত কালে এক রাশিয়ান গ্লাসনস্ত এর হাওয়া বয়ে গেল । এর কারণ ক্লাবের নতুন প্রেসিডেন্ট বুকাই এর বাবা গদাধরপানি গঙ্গোপাধ্যায় । বীণাপাণির এই আপাত নির্বাসনের কারণ অনুসন্ধানের পর এক সন্ধ্যায় তিনি তাঁর মনোবাসনার কথা প্রকাশ করলেন পূজা কমিটির সভায় ।

এবার সরস্বতী পুজো ক্লাবের বাইরে রাস্তায় করলে হয় না ? বেশ একটু বড় করে , ম্যারাপ বেঁধে ।
বলতে ভুলেছি , মিলনমেলার দুগ্গা আর কালী পুজো হতো রাস্তা জুড়ে প্যান্ডেল বেঁধে । অতএব এই প্রস্তাব শুনে ছেলে পিলের দল মেতে উঠল । রাস্তায় পুজো বলে কথা , এবার সাজগোজ তো আর যে সে ভাবে করা যায় না । বেত , বাঁশের ঘেরাটোপ , তাতে লাল নীল সবুজ কাগজের ডিজাইন, মণ্ডপের আঙিনায় আলপনা , পাশে দুসারি করে গাঁদা আর মরশুমি ফুলের টব – সব শেষে টুনি বাল্বের খেলা আর বড় আলোর ফোকাস। উফ ! এসবের সঙ্গে এবার জুড়ল ভিডিও ক্যাসেটে একটা বাংলা ও একটা হিন্দি “পারিবারিক” সিনেমা দেখাবার পরিকল্পনা । এক সন্ধ্যায় সব্বাই কে মাতিয়ে দিয়ে গদাধরপাণি মুচকি হাসলেন নিজের মনেই !!

সেদিন রবিবার । আরতির সাপ্তাহিক বাজার ফরমাইশ খেটে হেঁকু ক্লান্ত ও অবসন্ন সাত সকালেই। কোন ক্রমে এক কাপ চা নিয়ে বসে সে খবরের কাগজে সিনেমার পাতা খুলে চোখ বোলানো শুরু করেছে কি করেনি , ট্যাঁ ট্যাঁ করে বেল বেজে উঠল । ভারী বিরক্ত হল হেঁকু । এ নিশ্চয়ই রাজ মিস্ত্রির লোক জন ; হামলা হুজ্জত শুরু হবে এবার । বালি নেই , সিমেন্ট নেই আর নয়তো আজ কাজ হবে না – মিস্ত্রি নেই ! দরজার বাইরে হাসির আওয়াজে হেঁকু বুজতে পারে সে যা ভাবছে তা নয় । দরজা খুলে দেখল দাঁড়িয়ে আছে পাড়ার তিনটে ছোকরা । একটা , যার নাম ভুতে , কানচাপা বাবরি চুল বারংবার ঝাঁকিয়ে ঝঙ্কার তোলা যার স্বভাব , বেশ একটা সপ্রতিভ হাসি দিলো । ছেলেটাকে আগেও লক্ষ্য করেছে হেঁকু । ক্লাবের পাশে নয় নম্বরে সিকদার বাড়ির দেয়ালে বসে থাকে বিকেল থেকে । কচি কাকলি স্কুলের সাদা সবুজ ফ্রক পরা মেয়েরা থাকে তার নিশানায় । দেখলে তো মনে হয় ছেলেটা নিজে এগার বারো ক্লাসের ছাত্র । কিন্তু সে নিজে স্কুল না গিয়ে এমন অখণ্ড অবসরে কি ভাবে দিনের পর দিন কাটিয়ে দ্যায় হেঁকু বুঝতে পারেনা , বোঝবার চেষ্টাও যে খুব করেছে তাও না । পিছনের ছেলেটা যার হাতে একটা পেন আর রশিদ বই সেটা হল গদাধরের ছেলে বুকাই । প্রেসিডেন্ট বাপের সম্মান বজায় রাখবার দায়, দায়িত্ব সে কাঁধে তুলে নিয়েছে । মাঝে মাঝেই রশিদ বইয়ের পাতা উলটে দেকছে আর ডটপেনটা চিবুচ্ছে । তিন নম্বরটার পরনে একটা গুরু সার্ট আর চোঙ্গা প্যান্ট ! নতুন মুখ ।

-“কি ব্যাপার ? কি চাই তোদের “, হেঁকু জিজ্ঞেস করে ।

-“কাকু সরস্বতী পুজোর চাঁদা – মিলন মেলা ক্লাব !” ভূতে দাঁত বের করে উত্তর দ্যায় একটা চিকলেট জিভ দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে ।

হেঁকুর রবিবারের কাগজ পড়াটা একধরণের নেশার মতো । বিলাসিতাও বলা যায় । কাজের দিন হলে এমন সময়ে তাকে হয়ত পাঁচ নম্বর বাসের পেছনে দৌড়তে হত । সেই কাজে বাধা পড়াতে মেজাজটা গ্যাছে খিচড়ে।

-“আর সময় পেলি না তোরা ? পুজো তো আর আজ বাদে কাল নয় , কাল বাদে পরশুও নয় ; বলি এত তাড়া কিসের ?”

এবার ঐ পেন চিবনো ছেলেটা মাঠে নামে , “আসলে এবার তো আমাদের ক্লাবের পুজোটা হেব্বি বড় করে হচ্ছে। প্যান্ডেল বাঁধার ব্যাপার আছে । ডেকরেসন, লাইটিং এসব কি কম ঝক্কি , তারপর একটা স্মারক পত্তিকা বেরুবে !”

“কেন দিব্যি তো ক্লাবঘরের ভিতরে হচ্ছিল পুজো ; ভদ্রমহিলাকে টেনে হিঁচড়ে রাস্তায় নামানোর কি দরকার ছিল হে ?”

ভূতে এবার সপ্রতিভ ভাবে , চিকলেট মাখা দাঁতে, মাথা ঝাঁকিয়ে বেশ একটা দৃপ্ত ভঙ্গিতে ব্যাপারটা খোলসা করতে শুরু করে । – “কাকু আমাদের নতুন পেসিডেণ্ট বলেছেন এবার পুজো হবে ধুমধাম করে । বেশ মণ্ডপ সজ্জা , আলো টালো , গান সিনেমা এইসব আর কি । আর এই যে বুকাই – এর বাবাই তো আমাদের পেসিডেণ্ট।”

এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে খানিক হাঁপিয়ে পড়ে ভূতে । তিন নম্বর ছেলেটার কাছ থেকে একটা চিকলেট চেয়ে মুখে পোরে ।

“তাহলে কত লিখব কাকু ?” পেনটাকে বুকাই মুখের গহ্বর থেকে মুক্তি দিয়ে চাঁদার বিল বই তে মুক্তহস্তে দানের ফিরিস্তি লিখতে উদ্যত হয় ।

“দেখ তোদের একটা কথা বলি । পুজোর তো দেরী আছে । আমি যাতায়াতের পথে অবশ্যই চাঁদা দিয়ে আসব । যা দিয়েছিলাম গত বছর , তাই নাহয় দেব ।”

“কি যে বলেন কাকু ? এই তো পুরনো বই । আপনি গতবার দিয়েছিলেন পঞ্ছাশ টাকা – এবার তো একশো টাকা দেবেন । ” ভূতে তার পকেট থেকে একটা ছেঁড়া খোরা বিলবই বার করে প্রমাণ স্বরূপ । “আর তাছাড়া একশো টাকার ওপরে চাঁদা পোদানকারীদের নাম ছাপা হবে স্মারক পত্তিকায় !”

হেঁকু তার বিস্ময় ও বিরক্তি মেশানো মুখ নিয়ে এবার তিন মূর্তির ওপর ঝুকে পড়ে ।

– “সবাই কি দুগুণ চাঁদা দিচ্ছে ? না লোক বুঝে এই দাবী তোদের ? আমি ঐ পঞ্ছাশই দেব । কি বুঝলি ?”
এসব কথোপকথনের মাঝে কখন রামবলি মিস্ত্রি এসে দাঁড়িয়েছে হেঁকু খেয়াল করেনি । রামবলি বিহারের লোক , এই বড় এক জোড়া গোঁফ , ডান গালে একটা জরুল আর ভাঁটার মতন এক জোড়া চোখ । পরনে খাটো ময়লা ধুতি আর পকেট ছেঁড়া একটা পাঞ্জাবি । বগলের তলায় একটা ছোট ক্যাম্বিশের ব্যাগ আর হাতে একটা খৈনির ডিবে । রামবলি বহুদিনের ঢালাই মিস্ত্রি । হেঁকুর দাদুর সময়ের । রাজ মিস্ত্রি সালাম মিয়াঁ আর এই রামবলি – এই দুজনের ঝগড়াঝাটি দাদুর অত বড় বাড়িটার একেবারে সাড়ে বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছিল । উঠোন, ঘর , রসুই , বাথরুম , সিঁড়ি , ছাদ – সব কিছুর এক ভুল ভুলাইয়া তৈরি হয়েছিল এই দুজনের মিলিত হাতযশে । এই ঘর থেকে সেই ঘরে যেতে গিয়ে হঠাৎ হয়ত দেখলে নেমে গ্যাছে দু পাল্লা সিঁড়ি । তারপরেই হয়ত রসুইখানা । অপর দিকে বাথরুমের সামনে পৌঁছতে হয়তো বা তোমার পিঠ ঘষে যাবে দেয়ালে, এমনি সরু এক চিলতে একটা প্যাসেজ । কেন ছাদের সিঁড়ি গেটের সামনে শেষ না হয়ে এক চক্কর ঘুরে কলতলায় হবে এ প্রশ্নের উত্তর সে বাড়ির মালিক , বাসিন্দা সবারই ছিল অজানা । অবিশ্যি এরকম এক বেখাপ্পা বাড়ি বানাবার দায় শুধু দুই কারিগরের এমন কথা বলা যায় না , এর মধ্যে হেঁকুর দাদুরও কিঞ্চিৎ দায় ছিল ; যাক সে কথা । এত কিছু সত্বেও জীবিত কালে হেঁকুর বাবা এবং বিগত যৌবনে হেঁকু, সালাম মিয়াঁ আর রামবলির হাত থেকে মুক্তি পায়নি বা চায়নি নিজেদের সুবিধের কথা ভেবেই একথা দুজনে ভালই জানে । পেরেক আর বাঁশের খরচের ফিরিস্তি নিয়ে রবিবার সকালে রামবলি এসেছে দরবার করতে । এই ভাবে যদি হেঁকুভাইয়া কে বধ করে আরো খান দু তিনশ টাকা পকেটে পোড়া যায় । কিন্তু এখনো অব্দি সে কথাটা ভেঙেই উঠতে পারে না । সকাল থেকে তিনটে ছোকরা ঘিরে রয়েছে হেঁকুভাইয়া কে ।

“আমি ঐ পঞ্ছাশ টাকাই দেব । বাড়ি তৈরির কাজ চলছে এখন , বুঝতে পারছিস তো পকেটের অবস্থা তেমন ভাল নয় ।“

খানিক মুষড়ে পড়ে ছেলেগুলো । বোধহয় এই বাড়িতেই আজকের ইনিংসের প্রথম রান পাওয়া যাবে ভেবেছিল আর সেটা একেবারে উড়িয়ে ছক্কা মেরে । না হল না । বিরস বদনে এক খানা বিলের পাতায় পঞ্চাশ টাকা চাঁদা লিখে তারা বিদায় নিলে । কয়েকদিন বাদে ক্লাবে টাকা দিয়ে আসবে হেঁকু এমনি একটা বোঝাপরা হয়ে গেল ।
রামবলি গলি বেয়ে পিছনের উঠোনে এসে সুপুরি গাছের নীচে দু সারি ইঁটের উপর পাতা জোড়া তক্তার আসনে বসে সবে খৈনির ডিবে খুলেছে । মনে মনে ভাবছে আরও একডজন বাঁশ কিনে নিতে হবে । লোকজনের কাছ থেকে চেয়ে চিন্তে কতদিন আর কাজ করা যায় । ভাল ঢালাই করতে গেলে প্রচুর পরিমাণে তক্তা , দড়ি , পেরেক লাগে আর ঠেকনা দেওয়ার জন্য লাগে ভালো বাঁশ । একটু একটু বেশী দাম বলে ম্যানেজ করতে হবে । যেমন ভাবা তেমন কাজ । হেঁকু আসতেই একটা “হেঁ হেঁ” হাসি আসে রামবলির মুখ জুড়ে । ভরসার স্বাদ পায় যেন সে রসনায় ! – “বলসিলাম কি ভাইয়া , দু ডজন বাঁশ লাগেগা । আচ্ছা করকে ঢালাই দেনা হ্যাঁয় না । হামার কাছে যে কিসু ছিল তো দিয়ে দিলাম ; বাকি আপনি কিনিয়া লিন , কাম হয়ে গেল হাম কিনে লিব !”
মনে মনে রামবলির ফন্দি আঁটা ধরে ফেলে হেঁকু । হিসেব কষে দেখে বেশ কিছু টাকা বেমক্কা খসানোর তাল করেছে সে । নিজের পয়সায় বাঁশ না কিনে গঙ্গা জলে গঙ্গা পুজো করবার আয়োজন !

See Also
জ্যাঠামশাইর গরুরা

“এত গুলো বাঁশ তুমি আমায় দিয়ে কেনাবে রামবলি ? এটা ঠিক ? আমি খুব বেশী হলে আধা ডজন কিনে দিতে পারি ! ওতেই ম্যানেজ করতে হবে তোমায় !”

“সে কি বোলসেন ভাইয়া ! বাঁশ না হইলে হাম কাম করেগা ক্যাসে ?”

“সে তুমি বোঝো …”

মনে মনে ভারী দমে গেলেও মুখে কিছু প্রকাশ করে না রামবলি । সে চলে যায় এবং বিকেলের মধ্যেই ভ্যান গাড়ি চেপে মস্করকুল নিয়ে ফেরত আসে । সেদিন রাতের অন্ধকারে হেঁকুর হিসেবী মন কু ডেকে ওঠে । আরতির আলতার বোতল আর তুলি নিয়ে সে বাগানে নামে । সদ্য কেনা বাঁশের গায়ে ঢ্যাঁড়া মেরে আসে নিপুণ হাতে ।

ক্রমশ এগিয়ে আসে বসন্ত পঞ্চমী । ক্লাবঘর মেতে উঠেছে উৎসবের আনন্দে । ক্লাবের সামনে রাস্তার ওপর বেতের তৈরি মণ্ডপ সুন্দর করে সেজে উঠছে প্রতিদিন । বেশ রাত অবধি কান পাতলে ক্লাবের কর্মকর্তাদের হাসি , ঠাট্টা , তামাশার আওয়াজ পাওয়া যায় । এর মধ্যে ভূতে একদিন পথের মাঝে ধরেছিল হেঁকুকে ।
“কাকু তোমার বাড়িতে তো এখন কাজ হচ্ছে । তা মরশুমি ফুলের টব গুলো দাওনা প্যান্ডেল সাজাবার জন্য ।”
এক কথায় রাজি হয়ে যায় হেঁকু ।

“নিয়ে যাস আর না ভেঙে ফেরত দিস তাহলেই হবে ! ” হেঁকুর এই অভূতপূর্ব উদারতায় হাতে চাঁদ পায় ভূতে । পুজোর আগের দিন রাতে টব নিতে আসে ভূতে এবং আরও কয়েকজন । নিজেদের মধ্যে কি যেন গুজগুজ ,ফুস ফুস করে তারা । হেঁকু খানিক শোনবার , খানিক বোঝবার চেষ্টা করে । হেঁকুর থেকে তারা নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেয় যেন । এরকম একটা লুকোচুরির পরিবেশে অবশেষে বিদায় নেয় ছেলেপুলেরা । হেঁকু নিশ্চিন্ত হয়ে বাগানের দরজা বন্ধ করে ।

পরদিন সরস্বতী পুজো , এক আনন্দ সকাল । ক্লাবঘর থেকে বেশ উৎসবের মেজাজে গান ভেসে আসছে । খুশীর আমেজ ; রাস্তা জুড়ে দারুণ সাজে সেজেছে মণ্ডপ । দিনটা রবিবার , তাই যথারীতি হেঁকু এলিয়ে পড়েছে খবরের কাগজের শীতল ছায়ায় । যদিও পুজো তবু রামবলি মিস্ত্রির ছুটি নেই ! খানিক বাদেই দলিত খইনি হাতে তার আগমণ । আর তার খানিক বাদেই একটা হাহাকার করে এসে সে দাঁড়ায় হেঁকুর সামনে । ঢালাই কাজের জন্য রাখা একটাও বাঁশ নেই । সব বেমালুম ভ্যানিশ ।

“হেঁকু ভাইয়া , সব বাঁশ চোরি হো গ্যায়া , হায় রাম , হায় রাম ! ” ব্যাপারখানা বুঝতে হেঁকুর খানিক দেরী হয় । রামবলির পিছু পিছু সে এসে দাঁড়ায় বাগানে, যে খানে বাড়ি তৈরির কাজ চলেছে । একটাও বাঁশ নেই দেয়ালের পাশ ঘেঁষে যেখানে তাদের থাকবার কথা । এমনকি কে বা কারা সাত ফুট উঁচুতে অসমাপ্ত ঢালাইয়ের নিচ থেকে খুলে নিয়েছে দুখানা ঠ্যাকা দেওয়া বংশ দণ্ড ! রামবলি থেকে থেকে কপাল চাপড়ায় আর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কখনো রাম জি , কখনো হনূমান জি আবার কখনো সীতা মাইয়ার নাম ধরে ডাকাডাকি করে ।

ঘরে ঢুকে হেঁকু চিন্তার মহাসাগরে ডুব লাগায় । বিকেল নাগাদ , তখন পুজো মণ্ডপ মোটামুটি খালি , কর্মকর্তারা খানিক দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রায় , বিশ্রামে ব্যস্ত – ঠিক সেই সময় হেঁকু এসে দাঁড়ায় মণ্ডপের ঠিক সামনে । তার বাগানের ফুল গাছেদের চিনতে তো কষ্ট হয়ই না , বিনা ক্লেশে সে দেখতে পায় আরতির আলতা রঙে রাঙানো বংশ দণ্ডের অংশ । বুঝতে বাকি থাকে না ঝাড়েবংশে তাদের বেমালুম ঝেড়ে এনেছে ডেঁপো ছেলেগুলো । রঙিন কাগজ জড়িয়ে মণ্ডপের সামনে বেড়া বানিয়েছে তা দিয়ে । রামবলিও মুহূর্তে খুঁজে পায় তার সম্পত্তি ।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শহরতলির পাড়ায় বেশ এক অসন্তোষের ঝড় ওঠে । সন্ধ্যাবেলায় হেঁকু এবং গদাধরপাণি এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসে । সেই বৈঠকের আলোচনা ও সিদ্ধান্ত জানা যায় না । একদিন পরে বাঁশ , টব সব কিছু হিসেব মিলিয়ে ফেরত আসে । ব্যাপারটা বোঝা গেল কয়েকদিন পরে ক্লাবের স্মারক পত্রিকা বেরুনোর পরে । আটের পাতায় কৃতজ্ঞতা স্বীকারের পাতায় জ্বল জ্বল করে হেঁকুর নাম – পাশে লেখা “আমাদের বাঁশ দিয়ে সাহায্য করবার জন্য” !!!!!

What's Your Reaction?
Excited
0
Happy
1
In Love
1
Not Sure
0
Silly
0
View Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published.


Scroll To Top