Now Reading
স্বপ্ন-পিশাচ

স্বপ্ন-পিশাচ

Avatar photo
The patient sitting with a Psychiatrist

ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখেন তো। স্বপ্ন আমরা কম বেশি সবাই দেখি কখনো সুখু স্বপ্ন আবার কখনো দুঃস্বপ্ন । এমনই এক দুঃস্বপ্ন বাস্তবে ঘটে যাওয়ার গল্প সুমনের কলমে।

আমি সাইকিয়াট্রিস্ট নীলাঞ্জন চ্যাটার্জী, আজ আপনাদের কাছে একটা গল্প শোনাচ্ছি, গল্প…হুঃ যে ভাবে নেবেন আপনারা, আপনাদের কাছে গল্প হলেও আমার কাছে এটা গল্প নয়.. একটা ঘটনা.. যাক এত বেশি সময় নেবোনা,এবার শুরু করি-
আজ থেকে ছয় বছর আগে আমি আমার চেম্বারে বসে আছি রোগী দেখার জন্য, আমার রোগি দেখার টেকনিক টা একটু অন্যরকম, আমি দিনে মাত্র তিন জন পেশেন্ট দেখতাম আমাদের কাজটা অন্যান্য ডাক্তারদের থেকে একটু আলাদা, আমাদের কাছে মানুষ আসেন তাদের মানসিক যন্ত্রণা, অবসাদের থেকে মুক্তি পেতে বা মুক্তি পাবার আশায়, তারা হয়তো কিছুটা সময় বা ফ্রি স্পেস এক্সপেক্ট করেন আমাদের কাছে যাতে আমরা তাদের সমস্যার কথা মন দিয়ে শুনি।আই বিলিভ যে একজন পেশেন্টকে পেশেন্ট তকমা না দিয়ে একজন প্রকৃত বন্ধুর মতো তার কথাটা শোনা খুব ইম্পর্টেন্ট, তার পাশে থাকাটা ও খুব জরুরী।

ফিরে আসি মূল ঘটনায়।সেদিন ওই রাত আটটার দিকে আমি আমার লাস্ট পেশেন্টের অপেক্ষায় বসে আছি, বাইরে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে, আমার চেম্বারে কাচের স্লাইডিং উইন্ডো থেকে দেখতে পাচ্ছি অকাল বর্ষণে হেমন্তের সন্ধ্যা যেন মোহময়রূপ নিচ্ছে।
হঠাৎ রিসেপশনিস্ট বেল দিয়ে জানালেন যে লাস্ট পেশেন্ট উপস্থিত, আমি মোবাইল ফোন ব্যবহার করিনা, মানসিক রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে দেখেছি যে এই মোবাইল ফোনই মানুষের মানসিক রোগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই আমি এর ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছি, আমার বাড়ি, চেম্বারএ বং হসপিটালে আমি যোগাযোগের জন্য ল্যান্ড ফোনই ব্যবহার করে থাকি।আমার চেম্বার এর ইন্টারকম আর ল্যান্ড ফোনটা লাস্ট দুদিন যাবত ডেড ,তাই এই বেল এর ব্যবস্থা।

এই সময় স্লাইডিং ডোর ঠেলে যিনি ভেতরে ঢুকে এলেন তার বয়স ওই 45 থেকে 50 এর মধ্যে, দাঁড়িয়ে আছেন খানিকটা জুবু থুবু হয়ে, এবং তিনি কাঁপছেন, তার মাথায় কাঁচা পাকা চুল উস্কো খুস্কো, গালে কয়েক দিনের না-কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি, খয়রি চেক শার্ট সম্ভবত শেষ দু তিন দিন ধরে পরে আছেন, পরনের প্যান্ট টাওপরিষ্কার নয়, ভদ্রলোকের ভগ্নস্বাস্থ্য, ভদ্রলোকের পায় একটা রাবারের স্যান্ডেল যেটা এই শার্ট প্যান্টের সাথে পুরোপুরি বেমানান। স্পষ্টতই বোঝা যায় ভদ্রলোক এমন কোন সমস্যার মধ্যে আছেন যে নিজের দিকে নজরদেওয়ার সময় পাচ্ছেননা। মনে হচ্ছে কেউ তার দু চোখের নিচে এক পচকরে কালি ঢেলে দিয়েছে। কোটরের মধ্যে ঢুকে যাওয়া চোখ দুটো অত্যন্ত অস্থির, মানসিক অসুস্থতার স্পষ্ট লক্ষণ।

ভাল করে তাঁকে দেখতে দেখতে বুঝতে পারলাম যে ভদ্রলোক মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত, মনে হচ্ছে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যাবার আশঙ্কা তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তিনি যেন বহুদিন এই আতঙ্কিত অবস্থায় রয়েছেন। আমি আরো লক্ষ্য করলাম যে ভদ্রলোক ব্যক্তিজীবনে নিঃসঙ্গ একজন মানুষ, কারণ সাধারণত মানুষ সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে বাড়ির লোককে নিয়ে আসেন, নিদেনপক্ষে বন্ধু-বান্ধবকে নিয়ে আসেন, কিন্তু ইনি একাই এসেছেন। ভদ্রলোক এবার বললেন-

-নমস্কার

-নমস্কার প্লিজ বসুন, বি কম্ফোর্টেবল..

ভদ্রলোক ধীরেধীরে চেয়ারে বসলেন, ভদ্রলোক এখনো কাঁপছেন ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছেন তিনি, আমি এসি ররিমোটটা হাতে নিয়ে সেটা সুইচড অফ করলাম কিন্তু আমার মনে হল যে ভদ্রলোকের কাঁপুনির উৎস আজকের শীতল আবহাওয়া নয়, তার কাঁপুনির উৎসমনের কোনে জমে থাকা কোন বীভৎস আতঙ্ক, আমি এবার খুব স্বাভাবিক ভাবে তার দিকে তোয়ালে এগিয়ে দিয়ে বললাম-

– আপনিতো পুরো ভিজে গেছেন, ভালো করে মাথাটা মুছেনিন, হেমন্তের অকালবৃষ্টি.. বাইরেকি খুব ঠান্ডা? – হ্যা.. ঠান্ডা..

– চা খাবেন? আরাম পাবেন তাহলে।

ভদ্রলোক আমার প্রশ্ন শুনেও মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে বসে রইলেন, যেন এখনও কিছু ভেবে চলেছেন। আমি টি পট থেকে পেয়ালায় চা ঢাললাম, এবার জিজ্ঞাসা করলাম-

– দুধ চিনি চলবে?

এবার যেন ভদ্রলোক হঠাৎ নড়েচড়ে বসলেন, লজ্জিতভাবে বললেন

– সরি, না মানে লিকার চা-ই ভালো।

আমি আমার কাপে চা ঢেলে নিয়ে উনার দিকে কাপটা এগিয়ে দিলাম, ভদ্রলোক কাপটা হাতে নিয়ে বললেন – – -থ্যাঙ্কইউ

আমি এবার উনাকে জিজ্ঞাসা করলাম

– আপনার নামটা জানতে পারি?

আবার অপ্রস্তুত ভাবে উনি বললেন

-অঞ্জন.. অঞ্জন রায়..

-অঞ্জনবাবু, আপনার সমস্যার কথা খুলে বলুন ধীরে সুস্থে বলুন তাড়া হুড়ার কিছু নেই মানুষের মনে রগো পনীয়তা নিয়েই আমার কাজ সুতরাং আমাকে বন্ধু মনে করে সব কথা নিশ্চিন্তেই বলতে পারেন।

ভদ্রলোক চায়ে চুমুক দিলেন, তারপর আবার একটা বড় চুমুক দিলেন, আগের থেকে তাকে একটু ধাতস্থ মনে হল। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন ‘একটা স্বপ্ন’ বলেই চুপ করে গেলেন।আমি উদগ্রীব হয়ে বললাম-

– বলুন

তিনি পুনরায় নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ, তার পর আমি আবার নিস্তব্ধতা ভাঙলাম বললাম

– দেখুন, আপনি যদি সমস্যাটা না ভেঙ্গে বলেন তাহলে আমার পক্ষে আপনারজন্য কিছুই করা সম্ভব হবেনা।

অঞ্জন রায় সামান্য মাথাটা নামালেন, কয়েকটা চুমুকে অবশিষ্ট চা-খানা শেষ করলেন, বাইরে দুর্যোগ তখন আরো বেড়েছে, এর পর তিনি শুরু করলেন তার জীবনের ভয়াবহতম অভিজ্ঞতার কথা –

– স্বপ্ন দেখাটা ছিল আমার মুদ্রা দোষএর মত, প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন স্বপ্ন দেখতাম, উদ্ভট আজগবি সব স্বপ্ন.. যার সাথে বাস্তবতার বিন্দুমাত্র মিল নেই।তখন আমার বয়স হলো 18 বছর মত, 26 বছর আগে কার কথা.. আমি একটা স্বপ্ন দেখি.. সেটাও ছিল এইরকম দুর্যোগের রাত, আমার নিত্য দেখা স্বপ্ন গুলো থেকে একেবারেই আলাদা, এত স্পষ্ট সেই স্বপ্ন.. এত জীবন্ত.. যে তার গন্ধ, বর্ণ সবই আমি অনুভব করে ছিলাম সেই স্বপ্নে.. আমার জীবনের ভয়াবহতম দুঃস্বপ্ন ছিল সেটা, আমি নিজেকে একটা অপরিচিত বাড়িতে দেখলাম, নিশু তি রাত.. শীতকাল.. তীব্র ঠান্ডা আমি স্পষ্ট অনুভব করেছি।দেখলাম, অচেনা বাড়িটার বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছি আমি।অজপাড়াগাঁয়ের একটা বাড়ি.. টিনের চাল, বাঁশের বেড়া.. আমার একটা পা সিঁড়িতে, সিঁড়ি বেয়ে নামলেই মিডিয়াম সাইজের একটা ঝকঝকে উঠোন, গাছপালা দিয়ে ঠাসা একটা বাড়ি, ডান পাশে ঝাঁকড়া তেতুল গাছটা চোখে পড়ে সব থেকে বেশি, উঠোনে নামার উপক্রম করলাম, তখনি একটা শব্দ শুনলাম, পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ, লক্ষ্য করে তাকাতেই দেখলাম, একটা বড় পাখি.. বড় পাখি মানে ঈগলের মত বড় পাখি.. আমাদের এখানে কিন্তু দেখা যায়না, কিন্তু ভালো করে দেখতেই বুঝতে পারলাম যে ওটা বাজ বা ঈগল বা অন্য কোন পাখি নয় ওটা কোন পরলোকের জীব…

– এক মিনিট এক মিনিট অঞ্জনবাবু আপনার কি দেখে মনে হল ওটা পরলোকের জীব?!

-ডাক্তারবাবু, আপনি যদি ওকে দেখতেন.. তবে আপনিও এক বাক্যে স্বীকার করতেন যে, ওটা.. ওটা পরলোকের জীব.. ওটা পিশাচ..

-পিশাচ?! ইন্টারেস্টিং.. তার পর বলুন..

দেখলাম ভদ্রলোকের মুখ আবার খুব ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মুখে একবার হাত চালিয়ে নিয়ে তিনি বললেন

– ওই প্রাণীটা.. পিশাচটা উড়ে এসে বসেছে তেঁতুল গাছের একটা মোটা ডালে.. বিশ্বাস করুন, ওর চেহারা এখনো আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি.. ঢালু কপাল.. ডানা দুটো ধবধবে সাদা, আকারে অনেকটা বাদুরের ডানার মতো,.. দুচোখের জায়গায় চারটে কোনা রেডিয়াম বসিয়ে দেওয়া হয়েছে.. বাঁকানো মোটা ভ্রু.. শিকারি পাখির ঠোঁটের মতো নাক.. নিচের ঠোঁট এতটাই ঝুলে পড়েছে যে, থুতনি ঢেকে গেছে, লোলুপ সেই ঠোঁট বেয়ে লালা ঝরছে.. ধনুকের মত পিঠ.. সারা শরীরে বানরের মত লোমে ঢাকা.. খাটো পাএ এবং অস্বাভাবিক লম্বা হাতে দীর্ঘ নখ, ঠিক শিকারি পাখির মত গাছের ডালটাকে আঁকড়ে ধরেছে.. আর তার হাতে পাঁজা কোলা করে ধরা রয়েছে একটা লাশ.. সম্ভবত 2-1 দিনেরপুরনো, সদ্য পচন ধরা মাংসের উৎকট গন্ধ আমি পেয়েছি.. তবে সেই গন্ধ লাশের নাকি পিশাচের শরীরের তা বলতে পারব না.. লাশটা এক পাশে নামিয়ে রাখলো পিশাচটা.. তার পর ঘাড় কাত করে এ দিক ও দিক তাকাতে লাগল.. ওই প্রাণীটার তাকানো দেখলে পেঁচার কথা মনেপড়ে যায়.. ডাক্তার সেই তাকানোর ভঙ্গি দেখে আমার হৃদপিণ্ড লাফ দিয়ে গলার কাছে উঠে এলো, পিশাচটা এবার সরাসরি তাকালো আমার দিকে.. কিন্তু আমাকে দেখে পিশাচটার চোখে মুখে কোন ভাবান্তর দেখা গেলনা.. নির্বিকার ভাবে ফের লাশটাকে তুলে নিল, আর কচাক করে কামড় দিয়ে এক খাবলা মাংস তুলে নিল, চিবোতে লাগলো সশব্দে। প্রায় গলা অবদি উঠে আসা বমি আমি প্রাণান্ত চেষ্টা ঠেকালাম, পিশাচটা লাশের মাথা টা এক টান দিয়ে ছিড়ে ফেলে দিল গাছের তলায়.. আবার আমার দিকে তাকিয়ে এক ঝলক দেখল পিশাচটা, তার পর ডানা ছটফটিয়ে উড়ে গেল… আমি তখনও সিঁড়িতে এক পা দিয়ে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছি.. একটু ধাতস্থ হয়ে অবাধ্য পা দুটোকে টানতে টানতে এগিয়ে গেলাম গাছের নিচে..তৃতীয়ার চাঁদ আকাশে, তার আলোয় আমি স্পষ্ট দেখলাম.. দেখলাম, রক্তে মাখা মাখি হয়ে থাকা মাথাটা আমার বাবার… অপার্থিব এক আতঙ্ক নিয়ে চমকে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম আমি, সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে জব জব করছে, বুকের মধ্যে দামামা বাজছে যেন!! একজগ জল খেয়ে ও সেদিন তৃষ্ণা মেটাতে পারেনি। পরদিন রাতের বেলা হঠাৎ আমার বাবা স্ট্রোক হয়, হসপিটাল পর্যন্ত নিয়ে যাবার সময় পাইনি জানেন.. প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মারা যান..
অঞ্জনবাবু থামলেন, কপালের ঘাম মুছলেন। আমি বললাম –

– অঞ্জনবাবু, এতক্ষণ যে অতি প্রাকৃত ঘটনার কথা বললেন তার ব্যাখ্যা অত্যন্ত সহজ নয় কি?!

– হ্যাঁ, সহজ.. কাকতালীয় ঘটনা.. কো-ইন্সিডেন্স..

– তবে আমার ধারনা ঠিক এইকারণে আপনি আমার কাছে আসেন নি, 27 বছর আগের কাকতালী য়ঘটনা নিয়ে কোনো বুদ্ধিমান মানুষ বিচলিত হবেনা।

-ঠিক ধরেছেন ডাক্তার, ঘটনা শেষ এখানে নয়, সম্প্রতি আমার জীবনটাকে একটা মুর্তিমান বিভীষিকায় পরিণত করেছে এই স্বপ্ন.. প্রকৃত সমস্যাটা এখানেই..

– বেশ এবার প্রকৃত সমস্যার কথা বলুন।

– ডক্টর, এক কাপ চা পেতে পারি?

– অবশ্যই।

আমি আবার চা ঢেলে এগিয়ে দিলাম ওনার দিকে, আমিও এক কাপ নিলাম। বজ্র পাতে সামনে কোথাও ট্রান্সফর্মার বার্স্ট করল, আবার শুরু করলেন ভদ্রলোক-

– এই ঘটনার বছর দশেক পর আমি বিয়ে করি। আমার স্ত্রী গ্রামের মেয়ে, বিয়ের পর অষ্টমঙ্গলায় শ্বশুর বাড়ি গেছি, অজ পাড়া গাঁ। মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো, বাথ রুমে যেতে হবে, সিগারেটের তেষ্টাও পেয়েছে, পাশে আমার স্ত্রী অঘোরে ঘুমোচ্ছে।আমি উঠলাম, নতুন জামাই হওয়াতে সামনের দরজা দিয়ে না বেরিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বেরোনোই ভালো হবে স্থির করলাম। পেছন দিকে বাগানের পাশে ও একটা বাথরুম আছে আর সিগারেট ও খেতে হবে। পেছনের দরজা খুলে সিঁড়িতে পা দেওয়া মাত্রই আমার মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করতে লাগলো; বাড়ির পেছনের দৃশ্যগুলো আমার খুব পরিচিত মনে হল.. মনেহল, আমি এখানে আগেও এসেছি.. মুহূর্তে আমার দশ বছর আগেকার কথা মনে পড়ে গেল, আমি আবিষ্কার করলাম আমার জীবনের ভয়াবহতম দুঃ স্বপ্নের সেই বাড়িটিতে ঠিক একই ভঙ্গিমায় আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি.. সেই মাটির সিড়ি, মাঝারি উঠোন, সবুজ গাছ পালা, আর সেই ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছ।আরকী আশ্চর্য সে দিন ও আকাশে তৃতীয়ার চাঁদ.. প্রচণ্ড আতঙ্কে আমি জমে গেলাম, সময় যেন থেমে গেল। হঠাৎ সেই ডানা ঝাপটানোর শব্দ.. শব্দ, যতই এগিয়ে আসতে লাগল তার সাথে পাল্লা দিয়ে আমার হৃদপিণ্ড বুকের খাঁচায় সজোরে বাড়ি দিতে লাগলো। একটু বাদেই আমি সেই পিশাচকে দেখতে পেলাম.. তার পর ডাক্তার, আমার স্বপ্নটাকে বাস্তবে হুবহু দেখতে পেলাম, স্বপ্নের মতোই বাস্তবে পর পর ঘটনা গুলো ঘটে গেল.. পিশাচটা, আমাকে দেখলো নির্বিকার চোখে, কামড় দিয়ে একখাবলা মাংস খেলো হাতে ধরা লাশটা থেকে.. উৎকট লাশ পচা গন্ধ ধাক্কা দিলো আমার নাকে.. সেই আগের মতই পিশাচটা লাশের মাথাটা ছিড়ে ফেলে দিল গাছের উপর থেকে নিচে.. তার পর আমার দিকে দৃষ্টি হেনে উড়ে গেল ডানা ছট ফটিয়ে.. সেই স্বপ্ন পিশাচ। শক্তিহীন জম্বির মত টল মল পায়ে এগিয়ে গেলাম গাছের নিচে, আর একটা রক্তমাখা মাথা খুঁজে পেলাম দেখলাম সেটা আমার স্ত্রীর। আমি উন্মাদের মতো ছুটে এলাম ঘরে, দেখলাম আমার স্ত্রী ঠিক আগের মতই ঘুমোচ্ছে, ঘুমোচ্ছে নাকি সে মৃত.. আমি কাঁপা কাঁপা হাতে তার নাকের কাছে হাতটা ধরলাম, স্বাভাবিক উষ্ণ নিঃশ্বাস আমার হাতে লাগলো। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আমি বসে পড়লাম, উত্তেজনায় তখনো আমার বুক হাপরের মতো ওঠা নামা করছে। পরদিন সকালে উঠে শ্বশুর বাড়ি থেকেই কাজে বেরোলাম, বিকেল বেলা কাজের জায়গায় টেলিফোনে খবর পেলাম যে দুপুরবেলা আমার স্ত্রী আত্ম হত্যা করেছে, শোবার ঘরের কড়িকাঠের সঙ্গে সে ঝুলছিল, বিয়ের আগে ওই গ্রামের একটি ছেলের সঙ্গে তার প্রেম ছিল, বাড়ির লোক তাকে তার অমতে বিয়ে দিয়ে ছিল। সে নাকি আমার সঙ্গে সুখী ছিলনা, কিন্তু বিয়ের পর না আমাকে কিছু বলেছিল, না আমি কিছু টের পেয়ে ছিলাম।তখনই আমার মনে হল জানেন ডাক্তার, এই পিশাচটা বোধহয় প্রত্যেকদর্শনেই আমাকে কারোর মৃত্যুর পরোয়ানা জানিয়ে দিয়ে যায়।

ভদ্রলোক চুপ করলেন, মাথাটা নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ল তার, আমি সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলাম তার দিকে-

– আপনার স্ত্রীর মাথাটা কি করলেন?!- হ্যাঁ?!

গম্ভীর ঘোরের মধ্যে যেন চমকে বাস্তবে ফিরলেন ভদ্রলোক, আমি বলতে শুরু করলাম-

– হ্যাঁ আপনার ঘটনা অনুযায়ী আপনার জীবনে পিশাচটার দ্বিতীয় আগমনটা স্বপ্ন ছিলনা, ছিলবাস্তব! তাহলে আপনার স্ত্রীর মাথাটা যখন আপনি গাছ তলায় খুঁজে পেলেন, তখন সেটাও বাস্তব। তবে সেটা কোথায় গেল?! আপনার স্ত্রীর মাথাটা কি আপনি আর খুঁজে পাননি?! গেল কোথায় মাথাটা?!

অঞ্জনবাবু মাথা নিচু করে বললেন –

– এভাবে, আ গে কখনো ভেবে দেখিনি তো!

আমি এবার আমার গদিমোড়া চেয়ারটায় হেলান দিয়ে আরাম করে বসে বললাম –

– শুনুন অঞ্জনবাবু মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনুন, 18 বছর বয়সে আপনি একটি দুঃ স্বপ্ন দেখলেন, যে স্বপ্ন আপনার মনে গভীর রেখাপাত করল। ঘটে গেল একটা কাকতালীয় ঘটনা, মস্তিষ্ক তার অগণিত কোষের মধ্যে কোন একটাতেই দুঃ স্বপ্নের স্মৃতি কেসযত্নে সংরক্ষণ করল। বাংলা গ্রাম অঞ্চলের অধিকাংশ বাড়িতেই গাছ পালা থাকে, তার মধ্যে তেঁতুল গাছ খুব কমন একটা গাছ।আপনার শ্বশুরবাড়ি ও সে রকমই একটা বাড়ি, আপনি যখন সেখানে পা দিলেন, আপনার এক ধরনের ইলিউশন হল।আপনার মস্তিষ্ক উত্তেজিত হয়ে উঠলো অজুহাত পেয়ে সে পুরনো স্মৃতি গুলোকে উগরে দিল। আর ঠিক তখনই একটা হ্যালুসিনেশন হল। উত্তপ্ত মস্তিষ্ক একটা স্বপ্ন দৃশ্যকে আপনার সামনে হাজির করল। আপনি কি আমার কথা বুঝতে পারছেন?
অঞ্জনবাবু রোবটের মত বললেন-

– হ্যাঁ

– আপনার অসুখের নাম স্কিৎজোফ্রেনিয়া। রোগের মধ্যে এটা খুবই কমন আর চিকিৎসা না করালে ভয়াবহ একটা রোগ। তবে আমার মনে হয় আপনি স্কিৎজোফ্রেনিয়া প্রথম ধাপে রয়েছেন কারণ আপনার যুক্তি বোধ নষ্ট হয়নি। এই রোগে আক্রান্তরা মনে করে তাদের জীবনে একই ঘটনা বার বার ঘটছে, কাউকে দেখে ভাবে একে সে আগে কোথাও দেখেছে, তার স্থির বিশ্বাস জন্মেযায় তার কোনো সুপার পাওয়ার চলে এসেছে। বুঝতেপারছেন?

– হুম বুঝতে পারছি।

– কোন চিন্তা নেই অঞ্জনবাবু, আমি আপনাকে কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি, এর মধ্যে ঘুমের ওষুধ ও আছে। মানুষ স্বপ্ন দেখে হালকা ঘুমে, ঘুম গভীর হলে আর স্বপ্নটা দেখবেননা। এক মাস পরে দেখা করবেন, এর পর যদি সমস্যা থাকে তবে সাইকো থেরাপি দরকার হতে পারে। তবে ভয় পাবার কিছু নেই। আরেকটা কথা অঞ্জনবাবু, একই কাকতালীয় ঘটনা বা কো-ইন্সিডেন্স মানুষের জীবনে একাধিক বার ঘটতেই পারে। এরকম প্রচুর রেকর্ড আছে।

ভদ্রলোক এবার যেন কিছু বলতে গিয়ে একটু দ্বিধায় পড়লেন, তার পর অদ্ভুত অপার্থিব গলায় বলে উঠলেন-

– ডক্টর, এত বছর আগের বিষয়ে নিয়ে ও আজ আমি আপনার কাছে আসি নি, ঘটনা সেখানে শেষ হয়নি, প্রকৃত ব্যাপারটা আর ও ভয়াবহ..

প্রেসক্রিপশন লেখা থামিয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম তার পর শান্ত ভাবেই বললাম-

– বলুন

– ডক্টর আমার স্ত্রীর মৃত্যুর প্রায় পনের বছর পর হুবহু একই স্বপ্ন হয় মাস খানেক আগে আবার দেখি পিশাচটা যথারীতি লাশের মাথাটা ফেলে দিয়ে যায় এবং গাছের তলায় আমি একটি অপরিচিত মুখ কুড়িয়ে পাই। সেই মানুষটির নৃশংস ভাবে খুন হবার সংবাদ ছবি সহ ছাপা হয় পরদিন খবরের কাগজে।প্রায় প্রতিটি সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে চার দিন এই দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। স্বপ্নে পিশাচের ফেলে যাওয়া মাথাটা আমি পরদিন খবরের কাগজ বা টিভিতে দেখতে পাই। কারণ আমার স্বপ্নের প্রতিটি মানুষের মৃত্যু হয় অপঘাতে।

– কিন্তু অঞ্জনবাবু, অপঘাতে মৃত্যুর সব খবর তো টিভিতে বা নিউজ পেপারে আসে না?!

– তখন আমার কাছে চিঠি আসে।

– চিঠি?!

– হ্যাঁ, আমার লেটার বক্স আমি একটা চিঠি পাই। সেই চিঠিতে নাম ঠিকানা কিছুই থাকেনা, অজ্ঞাত নামাপ্রেরক বিনয়ের সাথে আমাকে অবহিত করেন সপ্নে দেখা ব্যক্তির মৃত্যু সম্বন্ধে.. এখন প্রতি রাতে ভয়া বহ আতঙ্ক নিয়ে অপেক্ষা করি কবে গাছ তলা থেকে আমার নিজের মাথাটা ঘুরিয়ে আনবো…

আমি এবার ভদ্রলোকের দিকে কিছুক্ষণ অপলক চেয়ে থেকে হাসি মুখে বললাম-

– দেখুন অঞ্জনবাবু, আপনি একজন স্কিজোফ্রেনিক, আগেই বলেছি এধরনের রোগীরা মনে করে তাদের মধ্যে কোন অতীন্দ্রিয় ক্ষমতায় এসে গেছে.. আপনার বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেছে পিশাচটা আপনাকে মৃত্যুর আগাম খবর দিয়ে যায়।আপনি নিশ্চয়ই একাথাকেন তাই না?!

– হ্যাঁ, স্ত্রীর মৃত্যুর পর আর বিয়ে করি নি।

– আপনার স্ত্রীর আত্ম হত্যা এবং বাবার মৃত্যু আপনার জীবনের বৃহত্তম দুটি ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আপনার স্বপ্ন পিশাচ। এই পিশাচই হয়ে উঠেছে আপনার নিঃসঙ্গ জীবনের বিভীষিকা ময় সঙ্গী। ধীরে ধীরে আপনি আক্রান্ত হয়েছেন স্কিজোফ্রেনিয়ায়। আপনি খবরের কাগজে একটি অপঘাতে মৃত্যুর খবর দেখছেন এবং ধরে নিচ্ছেন যে একেই আপনি স্বপ্নে দেখেছেন। কিন্তু আপনার এই ধারণা ভুল, আসলে এটা স্কিৎসোফ্রেনিয়া একটা সিমটম মাত্র।

– হুমম… কিন্তু ওই চিঠি!

– আচ্ছা ওই অজ্ঞাতনামাপ্রের কের কোন চিঠি কি আপনার কাছে আছে?

– না, পড়ার পরেই চিঠি গুলো আমি ছিড়ে ফেলে দিই।

– কেন?!

– আমার তখন হিতাহিত জ্ঞান থাকেনা ডক্টর..

– কারণটা আমি বলছি অঞ্জনবাবু, চিঠি গুলো আপনারই লেখা..

– মানে?!

See Also
Boy getting beating

– হ্যাঁ অঞ্জনবাবু, স্কিৎসোফ্রেনিকরা নিজেরাই নিজেদের প্রত্যাশা অনু যায়ী একটা ঘটনা ঘটায় এবং মনে মনে ভেবে নেয় ঘটনাটা অন্যকেউ ঘটাচ্ছে বা আপনা-আপনি ইঘটছে। আপনি ওই চিঠি লিখেছেন এবং নিজে নিজের লেটার বক্স ফেলেছেন।কিন্তু আপনি সেটা বুঝতে পারবেন না।কারণ আপনি সেই সময় কিছুটা হলেও হিতাহিত জ্ঞান শূন্য অবস্থায় থাকেন, কিন্তু আপনার অবচেতন মন মানে সাব কনসাস মাইন্ড কিন্তু সব জানে। সে কোন প্রমাণ রাখতে চাইছে না যে কাজটা আপনারই।
ভদ্রলোক কোন কথা বলছেন না, স্ট্যাচুর মত মাথা নিচু করে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছেন। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছ, আমি আবার বললাম –

– অঞ্জনবাবু, একটু চিন্তা করুন তো আপনাকে মৃত্যুর পূর্বাভাস দিয়ে কার কি লাভ?! আপনি তো কাউকে খুন করছেন না কিংবা আগে থেকে জেনে আপনি কোন দুর্ঘটনা ঠেকাতেও পারছেননা। সুতরাং আপনার ধারনা পুরো পুরি অযৌক্তিকনয় কি?! আর আমার ব্যাখ্যাটা কি এবার আপনার কাছে যুক্তি গ্রাহ্য বলে মনে হচ্ছে?

– হ্যাঁ, আপনার ব্যাখ্যা খুবই গ্রহণ যোগ্য।কিন্তু ডক্টর আমি স্কিৎসোফ্রেনিক নই..

– মানে?!

আমি এবার সত্যিই একটু বিরক্ত হলাম। লোকটা বলেকি? আমি সাইকিয়াট্রিস্ট, না কি সে! তাও আমি যথাসম্ভব কণ্ঠস্বর সংযত রেখে বললাম –

– দেখুন, আপনার সঙ্গে তো কেউ আসেনি তাই আপনাকেই সব বলতে হচ্ছে, মানসিক ভাবে অসুস্থ একজন মানুষ কখনই নিজেকে..

বলতে বলতেই থমকে গেলাম আমি। ভদ্রলোকের মুখ ভঙ্গি পরিবর্তিত হয়ে গেছে, চোখ দুটো কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে, কপালে সমস্ত মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেদিয়েছে, ভারী হয়ে উঠেছে তাঁর নিঃশ্বাস, হাঁপানি রোগীর মত সশব্দে টেনে টেনে শ্বাস নিচ্ছেন তিনি। থর থর করে কাঁপছেন মৃগী রোগীর মত। আমি এবার বিরক্ত কন্ঠে বললাম –

– অঞ্জনবাবু কি হয়েছে আপনার?! আপনার স্বপ্ন পিশাচ কি এই চেম্বারে উপস্থিত হয়েছে নাকি?!

– ডক্টর, এই ছবিটা কার?! ওই যে আপনার টেবিলের ফটোফ্রেমে..

আমার টেবিলের বাঁদিকে একটা সুদৃশ্য ফটোফ্রেম কাম পেনস্ট্যান্ডে আমার স্ত্রী-মেয়ে এবং আমার একটা ছবি আটকানো থাকে, ছবিটা আমার দিকে ঘোরানো থাকে। কিন্তু এখন প্রেসক্রিপশ নলেখার সময় বা অন্য কোন মুহূর্তে আমারই হাতে লেগে ফটোফ্রেমটা সামান্য অ্যাঙ্গেলে ঘুরে গেছে ভদ্রলোকের দিকে। আমি ভদ্রলোকের আঙ্গুল নির্দেশে চোখ ঘোরালাম, এবার আমি বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে গেলাম.. বললাম –

– এটা আমার মেয়ের ছবি। নাম মিঠাই। কেন অঞ্জন বাবু আমার মেয়ের চেহারার সঙ্গে কি আপনার পিশাচের মিল পাচ্ছেন??
অঞ্জনবাবু কঠিন মুখে বললেন-

– তারচেয়েও ভয়াবহ.. পরশু রাতে স্বপ্নে পিশাচটা যে মাথাটা গাছের নিচে ফেলে গিয়েছিল সেটা আপনার মেয়ের..

– কি?!

ভদ্রলোক দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন-

– হ্যাঁ ডক্টর, আমি স্বপ্ন দেখার 48 ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু সংবাদ আসে, 48 ঘণ্টা হতে আর মাত্র 7 মিনিট বাকি..

– অঞ্জনবাবু, আপনি কি আজ কোন মৃত্যুসংবাদ পেয়েছেন?

– না।

– সুতরাং আমার মেয়ের ছবি দেখে আপনি ধরে নিচ্ছেন তাকেই আপনি স্বপ্নে দেখেছেন। আপনি বাস করছেন একটি কল্পিত জগতে যা আপনারই সৃষ্টি। এক ধরনের ভয়াবহ ইলিউশন এর মধ্যে আছেন আপনি, যেটা মানসিক অসুস্থতার স্পষ্ট লক্ষণ।
ভদ্রলোক চুপ করে বসে আছেন। আমি এবার একটু সহানুভূতি সাথেই বললাম-

– শুনুন অঞ্জনবাবু, আপনি এক জন স্কিৎজোফ্রেনিক। একই কোইনসিডেন্স দুবার ঘটাও সেই সাথে নিঃসঙ্গতা আপনাকে মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। আপনার চিকিৎসা দরকার, আপনি আমার মেন্টাল ক্লিনিকে ভর্তি হন, আমি আপনার চিকিৎসা করব।আপনি ভালো হয়ে যাবেন।

– আপনার কনসালটেন্সি আমি নিচ্ছি না ডক্টর।আমি স্কিৎজোফ্রেনিক নই.. আমার বিশ্বাস, খুব শিগগিরই আপনার টেলিফোনটা বেজে উঠবে.. একটা মর্মান্তিক দুঃ সংবাদ পাবেন আপনি..

– আপনি এবার আসুন অঞ্জনবাবু..

আমি ঠিক করলাম যে এই রকম এক গুঁয়ে পাগলকে আর প্রশ্রয় দেবো না। বললাম-

– আপনি যখন বেশি বোঝেন, তবে আমার কাছে এসেছেন কেন?! কোন ভূতের ওঝা খুঁজে বার করুন.. আপনাকে কোন ফি দি তে হবেনা, কারণ আমি আপনার কোন চিকিৎসা করিনি। আর আমার ফোনটা দু’দিন যাবত ডেড, ঠিক হতে আরো দুইদিন সময় লাগবে, সুতরাং বাজার কোন প্রশ্নই আসেনা।

এই প্রথম অঞ্জনবাবুর মুখে হাসি ফুটল। মহা মূর্খের বোকামি দেখে যেমন কোনো বুদ্ধিমানের মুখে হাসি খেলে ঐ রকম।তার চোখটাও চিক চিক করে উঠলো। মুখে বললেন –

– ভালো থাকবেন ডক্টর, শক্ত থাকার চেষ্টা করবেন বাকি জীবনটা..

বেরিয়ে গেলেন ভদ্রলোক। উঠলাম আমি, বাড়ি ফিরতে হবে, বাইরে এখনো প্রচন্ড দুর্যোগ চলছে।গাড়ি আছে কিন্তু বৃষ্টিতে ড্রাইভ করাটাই চাপের, আমি ব্যাগে টুকি টাকি জিনিস গোছাতে শুরু করলাম। মেয়েটার কাল সেভেন্থ বার্থডে, সারপ্রাইস প্ল্যান করা আছে। হঠাৎ আমাকে হতবাক করে দিয়ে চেম্বারের ল্যান্ড ফোনটা নিস্তব্ধতাকে বিদীর্ণ করে কর্কশ শব্দে বেজে উঠলো.. আমি একই সাথে আশ্চর্য আর আতঙ্কিত হয়ে উঠলাম, দেওয়াল ঘড়িটা অঞ্জন বাবুর হিসেব অনুযায়ী সঠিক সময় দিচ্ছে… তবেকি এটাও কোন কাকতালীয় ঘটনা?! কিন্তু কাল পরশুর আগে তো ফোনটা ঠিক হবার কথা নয়… বুঝতে পারলাম আমার হাতের তালু ঘেমে উঠেছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, আমি এবার কাঁপা কাঁপা হাতে টেলিফোনের রিসিভারের দিকে হাত বাড়ালাম.. ফোনটা তুলতেই ও প্রান্ত থেকে আমার স্ত্রীর কান্না ভাঙ্গা গলা শুনলাম –

– মিঠাই… মিঠাই…

কান্নারদমকে পুরো কথাটা অস্পষ্ট শোনালো। কাছেই কোথাও সশব্দে বাজ পড়ল। আমি আর ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে ধমকে উঠলাম-

– কি হয়েছে?! কি হয়েছে আমার মিঠাইয়ের?!

– মিঠাই ব্যালকনি থেকে পড়েগেছে….

– কি?!

ফোনের রিসিভারটা আমার হাত থেকে খসে গেল।

এখনরাত 10 টা 57 মিনিট।ঘটনাটা পুরোটা শোনালাম আপনাদের। কি জিজ্ঞাসা করছেন?! না মেয়েটাকে বাঁচাতে পারিনি.. তেরো তলা ফ্ল্যাট এর বেলকনি থেকে পড়ে গেলে কেউ কি আর বাঁচে?! তবে মৃত্যু আর আমাকে ভাবায়না.. কত মৃত্যুই দেখলাম এর পরে.. মেয়ে-স্ত্রী-ভাই-বন্ধু-অপরিচিত..ওই ডানা ওলা নৃশংস প্রাণীটা.. ওই স্বপ্ন পিশাচটা, প্রত্যেকবার আমাকে মৃত্যু পরোয়ানা দিয়ে যায়। প্রত্যেকবার আমিও চিঠি পাই, কিন্তু আমার চিঠিতে পত্রপ্রেরকের নামটা জ্বল জ্বল করে.. “অঞ্জন রায়”.. শেষ স্বপ্নটা দেখেছিলাম ঠিক 47 ঘন্টা 53 মিনিট 13 সেকেন্ড আগে।পিশাচটা যার মাথাটা ছিড়ে ফেলে দিয়েছিল, সেই লোকটাকে না আমার মত দেখতে.. কিন্তু আমারতো কোন জমজ ভাই নেই.. অতএব এবার আমার পালা। কি বলছেন কোইন্সিডেন্স… হাঃহাঃহাঃ। অঞ্জন রায়, যাবার সময় আমাকে যেন কি বলে গিয়েছিল-

“ভালো থাকবেন ডক্টর, শক্ত থাকার চেষ্টা করবেন বাকি জীবনটা…”

হাঃহাঃহাঃ…

What's Your Reaction?
Excited
1
Happy
0
In Love
0
Not Sure
0
Silly
0
View Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Scroll To Top
Translate »