Now Reading
চিঠিপত্র –ভাগ – ৫

চিঠিপত্র –ভাগ – ৫

Avatar photo
A note book and a pen

পঞ্চম এবং অন্তিম পর্বে আবেগ ভরা চিঠিপত্র সায়ক এর কলমে।

ভাগ – ৫

চিঠিপত্র-১১

প্রিয়,

আরেকটা দুর্গাপুজো কাটল, তোমায় ঘিরে আমার অপেক্ষার পথ আরেকটু দীর্ঘ হল। একটা শাড়ি পাঠিয়েছিলাম পুজোয় আশা করি পেয়েছ..হ্যাঁ তোমার প্রিয় সাদা শাড়ি তবে এবার জামদানি না..খেস, আশা করি তোমার পছন্দ হবে।নয় নয় করে এই নিয়ে তোমাকে পাঁচখানা সাদা শাড়ি পাঠালাম, কি মুশকিল বলোতো আমি মরে যাওয়ার আগেই সাদা শাড়ি পড়া প্র্যাকটিস করছ..ব্যাস এইঅব্দি পড়ে তোমার ভুরু কোঁচকাবে; না মানে ঠিক আছে জানোইতো আজে বাজে কথা বলা আমার অভ্যেসের মধ্যেই পড়ে তাই বলে চোয়ালটা শক্ত না করলেওতো হয়..আমি আদতে ভীতু। তোমায় কিন্তু সাদা শাড়িটা বেশ মানায়, বুকের বাঁদিকে এখনো উইসেন বোল্টের গতিতে স্পিডোমিটারের কাঁটা ঘোরে..যাইহোক দেখেছো সব বলে যাচ্ছি অথচ বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাইনি..শুভেচ্ছা..।।

এবারের পুজোয় একটা অবাক কাণ্ড হয়েছে জানো? আমাদের পাড়ার সেই বিশুকাকুকে মনে আছে তোমার? হ্যাঁ যে আমাকে ছোটবেলায় বুড়ির চুল খাওয়াতো (ওই এখনকার বাচ্চারা যাকে ক্যান্ডি ফ্লস নামে চেনে)আমাকে বেহালা বাজিয়ে শোনাত.. বহুদিন আগেকার কথা সেসব..এখনো রাতের বেলা আমি যখন বারান্দায় রামের নেশায় তলিয়ে যাই মাঝে মধ্যেই, কাকুর জানলাটা থেকে বেহালার সুর ভেসে আসে না..থেমে গেছে আমার ছেলেবেলার সেই বেহালা বাজানো লোকটা..। যাইহোক সেই বিশুকাকু অষ্টমীর দিন এসে হাজির আমার বাড়ীতে, আমি তো অবাক; আমি ভাবছি কি হল হঠাৎ করে কাকু বলে তাকে একটি চিঠি লিখে দিতে হবে..আমি কাকে জিজ্ঞেস করায় সে বলে তার প্রথম এবং শেষ প্রেম..নন্দিনী..।। আমি তো পুরো ঘেঁটে ঘ..মানে এই আপনভোলা আধপাগলা বিশু কাকুর যে একখানা আস্ত প্রেমিকা থাকতে পারে তা আমাদের মাথাতেই আসেনি কোনোদিন..আসলে আমরাতো স্বাভাবিক মানুষদের প্রেম নিয়েই মত্ত থাকি..কিন্তু যারা পাগলের মতো প্রেমে পড়তে পারে তাদের খোঁজ রাখি কি? হয়তো রাখিনা..। প্রেমেতো সবাই পড়ে কিন্তু প্রেম কজনের জীবনে আসে..বিশুকাকু সেইসব রেয়ার স্পিসিস যাদের জীবনে প্রেম এসেছে..আমি তার জন্য একটা চিঠি লিখতে পারবোনা! এই ভেবেই বসে গেলাম নিজের কেরদানি দেখাতে..অনেক ভেবে অনেক কিছু লিখলাম বিশুকাকুকে পড়ালাম সে বুড়োর কিছুই পছন্দ হয়না..হঠাৎ আমার হাত থেকে খাতা কলম কেড়ে নিয়ে লিখে ফেললো

“কোনো চিঠির উত্তর নেই তাই কলম অভিমানী
তুমি আছো অথবা নেই এমনই অভ্যাসে
চিঠি আসুক নাইবা আসুক বসন্ত আসবেই
ডুব দিয়েছি তোমায় ছুঁতে অনন্ত সন্ন্যাসে…”

লিখেই বিশুকাকু ধাঁ..হ্যাঁ অনন্ত সন্ন্যাসে..সে জীবনের তল হয়তো আমরা পাইনা..অথবা পেতে পারি..জীবনে প্রেম এলে..কিন্তু সে প্রেমের খোঁজ কে দেবে? কেউ দিলে একমাত্র তুমিই দিতে পারো..এবার শীত শেষ হলে এসো..আগুন জ্বেলো আমার মৃতদেহে..আমি আবার হব ধান খুঁটে খাওয়া প্রেমিক চড়াই..।।

ইতি

প্রিয়

-সায়ক

 

চিঠিপত্র-১২

প্রিয়,

নতুন বছর কেমন কাটছে?আমার শীতকালগুলো বড্ড ফ্যাকাসে হয়ে আসছে। চোখের সামনে একটা নিকষ গাঢ় অন্ধকার। তীব্র জ্বর এলে যেমন চোখ জ্বালা করে ঠিক তেমনই একটা অনুভূতি হচ্ছে। আমরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে যে সময় মানুষের কথা বলতাম সেই সময় গুলো পেরিয়ে এসেছি। এখন শুধুমাত্র জীবাশ্ম হয়েই পড়ে আছি। অসার।

আজকে মনে পড়ছে যেদিন তোমায় প্রথম দেখেছিলাম সেদিন নিজেকে তথাগত মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল পৃথিবীর একটা নতুন দিক খুলে গেছে আমার চোখের সামনে। নিজেকে খুব শান্ত পেয়েছিলাম। একটা পাহাড়ি নদী সমতলে এসে যেমন গভীর হয় অথচ অপেক্ষাকৃত শান্ত ঠিক তেমনই। তুমি একদিন আমাকে বলেছিলে উত্তর কলকাতার অলিগলির গল্প, মফস্বলে ছোট্ট চায়ের দোকানের গল্প, তোমার লাফ দড়ির বান্ধবীদের গল্প, তোমার অঙ্ক স্যারের গল্প, তোমার প্রথম লেখা কবিতার গল্প, তোমার প্রথম যৌবনের প্রেমিকের গল্প। নিজেকে মৌন পাহাড়ের মতন লাগছিল। যার চূড়ায় বসে তুমি দিন যাপনের ধারাপাত পড়ছিলে।
তোমাকে যেদিন প্রথম অনুভব করলাম সেদিন আমার সর্বাঙ্গে জাতিস্মরের শেকড় জড়িয়ে উঠছিল। আমার সমস্ত দামালপনা তোমার বন্যায় ভেসে গেল। আমরা কথা দিয়েছিলাম একে অপরের সাথে ঘর বাঁধব। একে অপরকে বুকের ওপর আগামীর ইতিহাস লিখব।

আমি আজও ঠায় বসে তোমার অপেক্ষায়। দিন কাল মাস বছর পার করে। শীতকাল আসে শীতকাল যায়। তুমি কবে আসবে?

ইতি

প্রিয়

-সায়ক

 

চিঠিপত্র-১৩

প্রিয়,

জানি দুশ্চিন্তায় আছো.. এখানে পৌঁছেও পৌঁছসংবাদ জানাইনি। অস্বীকার করছি না দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক.. অন্যকেউ হলে এতক্ষনে থানা পুলিশ করে ফেলত.. বাঁচোয়া এই যে তুমি মজ্জায় মজ্জায় আমার দুষ্কর্মগুলোর সাথে ওয়াকিবহাল.. আমার খামখেয়ালিপনার জন্য আজ অব্দি সবচেয়ে যে মানুষটি ভুগেছে সেটা তুমি.. বিরক্ত হয়েছ.. অশান্তি করেছ.. ছেড়ে চলেও গেছ.. কিন্তু আবার ফিরতে বাধ্য হয়েছ এইভেবে তুমি ছাড়া আর কেউ এই খামখেয়ালিপনা সহ্য করবে না..আচ্ছা শোন এই চিঠি লিখছি যেখানে বসে সেখানে মোবাইলের টাওয়ার পৌছয়না..।। প্রকৃতি নিজের ইচ্ছেমত নিজেকে সাজিয়ে রেখেছে এখানে..সারি সারি গাছ স্পর্ধায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এখানে..তথাকথিত সভ্য মানুষের অস্তিত্ব অস্বীকার করে এখানকার আশ্চর্য সভ্য মানুষের দল..তারা রাজনীতি করেনা..একে অপরকে লুঠ করে না..ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করে না..কেউ কারোর ওপর শাসন কায়েম করার কথা বলে না..এদের মধ্যে আমার প্রথমদিনই দুটো ছেলে মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব জমেছে..সম্পর্কে তারা স্বামী স্ত্রী..এদের একসাথে থাকার রীতি হল ফুল বিনিময় করতে হয়. .সেই সুত্রে ভাবলাম তাহলে তো তোমার সাথে আমার কবেই বিয়ে হয়ে গেছে..ফুল দিয়েছি কবিতা দিয়েছি.. এমনকি জ্যোৎস্না ধোয়া রাতের জানলায় বসে তোমার ঠোঁটে ঠোঁটও ডুবিয়ে দিয়েছি পরম নিশ্চিন্তে… ভালোবাসা কি শব্দের মুখাপেক্ষী থেকেছে কখনো? নতুন নাটকের চিত্রনাট্য অথবা কৃষক আত্মহত্যার দিশেহারা অস্থির রাতে যখন শান্ত হয়েছি ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা “আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে” তে..তখন আলাদা করে বলতে হয়নি আমি অসীম ভালোবাসার মায়ায় বেঁধে গেছি..।। ঠিক করেছি আবার একসাথে সেই পাহাড়ি বৌদ্ধ গুম্ফাটায় যাবো..আবার কেন? কারন মেপে দেখবো কার অনুরণন বেশি? গুম্ফার সেই বিশাল ঘণ্টার নাকি আমার জীবনে তোমার ব্যাপ্তির..বাকিটা ব্যাক্তিগত…।।

ইতি

See Also
The torture done to Neera Arya

প্রিয়

-সায়ক

 

চিঠিপত্র-১৪

প্রিয়,

আজ নবমী.. তোমার কাছে এই চিঠি যখন পৌঁছবে তখন হয়তো তোমার কলেজ খুলে গেছে.. তুমি আবার রোজকার মতো দিদিমণির ভূমিকা পালন করছ গম্ভীর মুখে.. এইবারও পুজোতে ফিরতে পারলাম না.. হয়তো তুমি অপেক্ষায় ছিলে.. কি করব বলো যেদিন আসার ট্রেন ছিল সেইদিন রেশমা বিবির পাঁচ বছরের মেয়েটার প্রচণ্ড জ্বর এলো.. ওইটুকু একরত্তি মেয়ে সারাদিন কাকু কাকু বলে আসে পাশে বেড়াল ছানার মতো ঘুরে বেড়ায়.. আর তুমি তো জানো এটা জলা জঙ্গল এলাকা.. ডাক্তার পাওয়াই দুষ্কর..! রেশমার বরের ফিরতে ফিরতে অষ্টমী হবে.. ওদের একদম একা ফেলে আসতে মন সায় দিচ্ছিল না.. তাও রেশমা বলেছিল দাদাবাবু “দাদাবাবু ফিইরে যান..দিদিমনি পথ চেই আসে..” কিন্তু বিশ্বাস করো আমার মনে হল আমি যদি চলে আসি হয়তো ফিরে আমার চিনি কে আর দেখতে পাবো না.. রক্তের সম্পর্ক তো কিছুই নেই মেয়েটার সাথে.. তবু কেমন একটা মায়ায় জড়িয়ে ফেলেছে ওই টলটলে মুখটা। আমি উপেক্ষা করতে পারলাম না.. থেকে গেলাম.. টানা সাত আটদিন যমে মানুষে টানাটানি চলেছিল.. রেশমা বটতলার বুঢ়া শিবের থানে গিয়ে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতো.. কি অদ্ভুত হও তোমরা মায়ের জাত.. মায়েদের বোধহয় কোনো ধর্ম হয়না.. নাঃ কে বাঁচিয়েছে জানি না, রেশমার আল্লা না রেশমার বুঢ়া শিব নাকি শওকত বদ্যির হোমিওপ্যাথির বড়ি.. তবে মেয়েটার পাশে বসে যখন জলপট্টি দিতাম মনে পড়ত মায়ের কথা.. মনে পড়ত তোমার কথা.. আমার মাথায় অত স্নেহের সাথে যে আর কেউ হাত বুলিয়ে দেয়নি.. সেই জন্যই তো বলি তুমি মায়ের মতোই ভালো.. আটদিনের মাথায় ভোরবেলা মেয়েটার জ্বর ছাড়লো.. চোখ মেলল.. ভোরের প্রথম আলো ওর মুখে এসে পড়ছিল.. ওর হাসি মুখটা দেখতে দেখতে রেশমা কেঁদে ফেললো অনেক কঠিন একটা যুদ্ধ জেতার অনাবিল আনন্দে.. চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিচ্ছিল মেয়েটাকে.. ওইরকম একটা দৃশ্য দেখতে দেখতে আমার মনে হচ্ছিল এইতো দেবীপক্ষ শুরু হল..।।

এবার পাতাঝরা মরশুম শেষে ফিরছি কলকাতা.. অনেকদিনের ছুটি নিয়েছি.. এবার একসাথে দেখবো পলাশ ফুটছে গাছে..

অনেকদিন পর পাশাপাশি হাঁটবো আমাদের প্রিয় শহরে.. সবটুকু না পাওয়া মিশে যাবে শিশিরভেজা রাতে….
শরীরের যত্ন নিও

ইতি

প্রিয়

What's Your Reaction?
Excited
0
Happy
0
In Love
0
Not Sure
0
Silly
0
View Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Scroll To Top
Translate »